শুভ হোক জন্মদিন
জানি চাইবে না, উষ্ণ চুম্বনে অমিয় নিস্তব্ধতায় ডুবে যাক শরতের পুরোটা বেলা, ভারসাম্যহীন কম্পন ঘোরে ছুয়ে দেক বিচলিত আঙ্গুলেরা, বর্ধিত হোক শ্বাসের ধ্বনি।
রাত
সূর্যকে ঢেকে তার কালোকেশে, জননীর নিখাদ মমতায় ঘুম জাগিয়ে পৃথিবীর চোখে, মধুর গুঞ্জনে আঁচলে বেঁধে নক্ষত্র রাত নেমে আসতো সুচতুর- ক্রমশ উচু হওয়া বিনাশী দেয়াল ডিঙ্গিয়ে, মখমলের শয্যায় ছলকে দিতে কামনার জল নামাতো বৃষ্টি অঢেল।
জর্নাল, শ্রাবণ (কবি শামসুর রাহমান)
তুমি আসবে না নিঃশব্দে নিঃসঙ্গ এই চেনা বাগানের দরজা খুলে ফাল্গুনের বিহ্বল দুপুরে মাড়িয়ে ঘাসের পিঁপড়ে, শুকনো পাতা সিঁড়ির নির্জন বাঁক ঘুরে এসে শিশিরের মতো স্বেদকণা মুছে মিহি রুমালে, হাওয়ায় প্রীত তুমি মৃদু টোকা দেবে না দরজায়; গানের গুঞ্জনে আর উঠবে না ভরে দক্ষিণের শূন্য ঘর প্রহরে প্রহরে।
শনিবার, ৩০ আগস্ট, ২০১৪
ছোটগল্প লেখার নিয়মকানুন (সংগৃহীত)
সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ ছোটগল্প। এর মাধ্যমে লেখক মানব জীবনের সেই অংশ তুলে ধরেন যা শাশ্বত জীবন আর মানবতাবোধের মূর্ত কিংবা বিমূর্ত ছবি। ছোটগল্পকে কোনো সংজ্ঞার নিয়মকানুনে বাঁধা যায় না। এর বিচরণ বহুমাত্রিক। তারপরও এর একটি রূপ তুলে ধরার জন্য আমরা প্রায়ই রবিঠাকুরের ‘সোনার তরী’ কাব্যগ্রন্থ থেকে ‘বর্ষাযাপন’ কবিতার সেই পঙ্ক্তিগুলো স্মরণ করি যেখানে বলা হয়েছে:
‘ছোটো প্রাণ, ছোটো ব্যথা ছোটো ছোটো দুঃখ কথা
নিতান্তই সহজ সরল-
সহস্র বিস্মৃতিরাশি প্রত্যহ যেতেছে ভাসি,
তারি দু-চারিটি অশ্রুজল।
নাহি বর্ণনার ছটা ঘটনার ঘনঘটা,
নাহি তত্ত্ব, নাহি উপদেশ-
অন্তরে অতৃপ্তি রবে, সাঙ্গ করি মনে হবে
শেষ হয়ে হইল না শেষ।’
রবিঠাকুর এই কথাগুলো বলেছেন, ১২৯৯ বঙ্গাব্দের ১৭ই জ্যৈষ্ঠ। আজও ছোটগল্পের বিষয়ে আলোকপাত করতে গিয়ে আমাদের কবিতার এই পঙ্ক্তিগুলোর উল্লেখ করতে হয়। প্রকৃতপক্ষে ছোটগল্প জীবনের একটি খণ্ডিত অংশ হতে পারে। সেই অংশ দিয়ে জীবনের বিশাল রূপ দৃশ্যমান হয়। যেন অনেকটা সেই ছোট জানালা যা দিয়ে বিশাল আকাশটা দেখা যায়।
আমাদের জীবনপ্রবাহে হাজার হাজার ঘটনার, উপলব্ধির সেই অংশটি ছোটগল্পের উপাদান যা জীবন আর মানবতাবোধের পটভূমিকায় বিশেষত্ব লাভ করেছে। এখানেই এর মহত্ব এবং তাৎপর্য। এখানে কোনো তাত্ত্বিক কথা নেই, ঘটনার অতিরঞ্জিত বর্ণনা নেই এবং কোনো উপদেশবাণীও নেই। লেখক গল্পের ঘটনা, চরিত্র আর মার্জিত বিবরণের সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে চলেন যবনিকার শেষপ্রান্তে। তারপর যেন মনে হবে, শেষ পরিণতিটা আর একটু জানা হলে ভালো হতো। বস্তুত লেখক সেটি পাঠকের জন্য ছেড়ে দেন। পাঠক ছোটগল্প পড়তে গিয়ে নিজের মধ্যে যে ভুবন তৈরি করেন সেখানে একটি সমাপ্তি বা উপসংহার টেনে নিতে পারেন যেখানে তৃপ্তির অতৃপ্তির একটি প্রভাব থেকে যায়।
ছোটগল্পে এক বা একাধিক সুনির্দিষ্ট এ্যকশনের মাধ্যমে একটি ঘটনা বা কাহিনীর বর্ণনা হয়ে থাকে। লেখক এই কাহিনী বা গল্প সেই সুনির্দিষ্ট এ্যকশনের ধারাবাহিকতার ক্রমানুসার ধরে লেখেন। আর এটি বলতে গিয়ে এক বা ততোধিক ব্যক্তির সমাবেশ ঘটান এবং তাদের দ্বারা সেই ঘটনাক্রম ঘটে থাকে। এই ঘটনাক্রম যে এ্যকশনের মাধ্যমে ঘটে থাকে আর পরিশেষে একটি কাহিনীর সুবিন্যস্ত রূপ দেখা যায় তাকে বলা হয় ‘প্লট’। ঘটনাগুলো কিছু ব্যক্তি বা চরিত্রের দ্বারা নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট স্থানে ঘটে থাকে। এই ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের স্ব স্ব নিজস্বতা রয়েছে, যেমনভাবে রয়েছে তাদের পৃথক পৃথক ভূমিকা। তারা একেকজন একেকমতো কথা বলে। তাদের চেহারা আমাদের পরিচিত পরিবেশ থেকে তুলে নেয়া অথবা কল্পনার জগৎ থেকে। তারপরও লেখকের লেখার স্টাইলে এই ব্যক্তিগুলো আমাদের চোখে স্বতন্ত্ররূপে মূর্ত হয়ে উঠে। তাদের এক একটি চরিত্র পাঠকের চোখে পৃথকভাবে ভেসে উঠে। এই চরিত্রগুলো গল্পের প্রাণ। তারা গল্পের মাঝে যেমন নির্দিষ্ট একটি ফ্রেমে বাঁধা থাকে তেমনভাবে সুনির্দিষ্ট এক বা একাধিক স্থানের মাঝেই তাদের বিচরণ। সুতরাং সময় এবং স্থানের ভূমিকা ও গুরুত্ব গল্পের কাহিনীকে জীবন্ত করে থাকে যাকে আমরা বলতে পারি ছোটগল্পের সেটিং। পরিশেষে যে কথাটি লেখক বলতে চান অথবা যা পাঠকমনে জেগে উঠতে পারে তা গল্পের মূল বক্তব্য বা থীম। পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষার সাহিত্যে বিভিন্ন রকমের, বিভিন্ন স্বাদের, বিভিন্ন গল্প রয়েছে যেখানে লেখকগণ বিভিন্ন সময়ের হাজারও স্থানের ছোটগল্প লিখেছেন এবং লিখছেন। আর এসব ছোটগল্প যে বিচারেই বিশ্লেষণ করা যাক না কেন সেটা কখন, কোথায় কিংবা স্টাইল ও পরিধি ধরে বিচার করলেও উপরোক্ত উপাদানগুলো পাওয়া যাবে। মুলত এগুলো ছোটগল্পের মৌলিক উপাদান। বিষয়টি আরও একটু পরিষ্কারের চেষ্টা করা যাক।
একটি ছোটগল্পে এমন কি বড়গল্পেও মূলত চারটি উপাদান থাকে। এগুলো হলো ১) প্লট ২) চরিত্র ৩) সেটিং ৪) থীম। এগুলো ছোটগল্পকে জীবন্ত ও সুখপাঠ্য বৈশিষ্টমণ্ডিত করে।
১) প্লট (Plot):
এটি হলো গল্পের মেরুদণ্ড। আভিধানিকভাবে প্লট বলতে বোঝায়, যে ঘটনাসমূহ ধারাবাহিকতার ক্রমানুসার ধরে গল্পের মধ্যে প্রকাশিত বা বিকশিত হয় তাই প্লট। লেখক এখানে ঘটনাক্রমগুলো অত্যন্ত সুবিন্যস্তভাবে এক এক করে লেখেন। এটি কোনোক্রমেই এলোমেলো হয় না। এটি কাহিনীর প্রয়োজনে কোনটি আগে কোনটি পরে লেখক তা তার দক্ষতার গুনে সাজিয়ে থাকেন। এই সুবিন্যস্ত ধারাক্রম কাহিনীকে একটি পরিণতি বা সমাপ্তির দিকে নিয়ে যায়। তাই লেখককে গল্প লেখার সময় কাহিনীর একটি ধারাক্রম সাজিয়ে নিতে হয়। তিনি গল্পের মূল থীমকে লক্ষ্য করে কোথায়, কখন ও কোন্ ঘটনার বিবরণ দেবেন তা দক্ষতার সাথে নির্ধারণ করেন। লেখকগণকে বেশিরভাগ ছোটগল্পে প্লট সাজানোর জন্য পাঁচটি কাঠামো বা উপাদান অনুসরণ করতে দেখা যায়। এগুলো হলো: ক) ভূমিকা বা শুরু খ) ঘটনার আরোহণ গ) চরম পরিণতি বা ক্লাইমেক্স ঘ) ঘটনার অবরোহণ ঙ) সমাপ্তি বা পরিশেষ।
ক) ভূমিকা বা শুরু:
ছোটগল্প শুরু করতে হয় একটি আকস্মিক ঘটনা বা ঘটনার কথা দিয়ে যাতে পাঠক খুব সহজেই পরবর্তী লেখাগুলোয় আকর্ষিত হতে পারেন। এটি শুধু যে ঘটনার কথা হতে হবে এমন কথা নেই, সেটি চরিত্র বর্ণনা, কাহিনীর পরিস্থিতি, সংঘাতময় কোনো কথা, সামগ্রিক কাহিনীর সেটিং অথবা গল্পের থীমের বক্তব্য দিয়েও শুরু করা যেতে পারে যেখানে তা পাঠকের কাছে আকস্মিক বিস্ফোরণের মতো মনে হতে পারে এবং তিনি আগ্রহের সঙ্গে গল্প বা কাহিনীর পরবর্তী অংশে সহজে প্রবেশ করতে পারেন।
খ) ঘটনার আরোহণ:
গল্পে ঘটনা একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ অংশে এটির সূত্রপাত ও তার এগিয়ে যাওয়া দেখতে পাওয়া যায়। পাঠক লেখকের সঙ্গে সঙ্গে ঘটনার মধ্যে সংশ্লিষ্ট হয়ে যান। তার চোখের সামনে ঘটতে থাকে এক একটি ঘটনা। এই ঘটনাগুলো হতে হয় আকর্ষণীয়, প্রয়োজনানুগ, বাহুল্যমুক্ত, কাহিনীর সাথে সংশ্লিষ্ট বা সামঞ্জস্যপূর্ণ। এসব ঘটনা ধারবাহিকভাবে ঘটতে ঘটতে একটি পরিণতির দিকে অগ্রসরমান থাকে। লেখক মূলত ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে এখানে সেই ঘটনাগুলোর জন্য চরিত্র নির্মাণ করেন অথবা সৃজিত সেই চরিত্রগুলো ঘটনা ঘটিয়ে চলে। এ ঘটনাগুলোর মধ্যে পারস্পরিক মিল-অমিল ও দ্বন্দ্ব-সংঘাত গল্পের কাহিনীকে একটি চূড়ান্ত পরিণতি দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। লেখক যা বলতে চেয়েছেন গল্প শেষে পাঠক তা সহজে আবিষ্কার করেন।
গ) চরম পরিণতি বা ক্লাইমেক্স:
ছোটগল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ এটি। এখানে লেখক ঘটনার যে ধারানুক্রম বর্ণনা দেন এবং যেখানে ঘটনা ও চরিত্রগুলোর মধ্যে মিল-অমিল ও দ্বন্দ্ব-সংঘাত, চরিত্রগুলোর নিজ নিজ স্বকীয়তা ও তাদের স্বতন্ত্র ভূমিকা গল্প বা কহিনীকে পাঠকের মনন জগতে চাক্ষুস বা জীবন্ত করে চলে তার চূড়ান্ত ও আবেগময় এক পরিণতি আবহ তৈরি হয়। পাঠক এখানে গল্পের ও চরিত্রের মধ্যে সমস্যা বা বর্ণিত ঘটনার একটি চরম রূপ দেখতে পান। ঘটনা ও চরিত্রগুলোর মধ্যে সংঘটিত বিভিন্ন এ্যকশনের এই চরম রূপ পরবর্তীতে কাহিনীর পরিণতি বা শেষ নির্ধারণ করতে সহায়ক হয়।
ঘ) ঘটনার অবরোহণ:
ছোটগল্পে বর্ণিত কাহিনীর চরম পরিণতি নির্ধারণ করে দেয় যে, ঘটনাগুলোর শেষ কিভাবে হতে যাচ্ছে। এখানে বর্ণিত কাহিনী এবং তার মধ্যে ঘটনা ও চরিত্রগুলোর মিল-অমিল ও দ্বন্দ্ব-সংঘাত নিম্নমুখি বা সমাধানমূলক হতে থাকে। পাঠককে একটি চূড়ান্ত পরিণতি তা স্বস্তিদায়ক বা আনন্দের বা বিষাদের হতে পারে সেদিকে ধাবিত করে। তিনি বুঝে নিতে পারেন যে গল্পের শেষ কোথায় ও কিভাবে হতে যাচ্ছে।
ঙ) সমাপ্তি বা পরিশেষ:
ছোটগল্প শেষ হয়েও শেষ হয় না। পাঠকের মনে একটি অশেষের জিজ্ঞাসা বা অতৃপ্তি রেখে দেয় আর প্রকৃতপক্ষে এখানেই ছোটগল্পের সার্থকতা। কাহিনীর সূত্রপাত, ঘটনা ও চরিত্রগুলোর মধ্যে বিভিন্ন এ্যকশন, সেসবের দ্বন্দ্ব-সংঘাত-সামঞ্জস্য ছোটগল্পকে যে পরিণতির দিকে নিয়ে যায় মূলত এটিই সেই কাহিনীর বক্তব্য ও সিদ্ধান্ত। লেখককে নির্ধারণ করতে হয় তিনি আসলে এই কাহিনীর দ্বারা কী বলতে আগ্রহী এবং তিনি কোথায় কোন্ অবস্থানে থেকে সেই সিদ্ধান্ত বা বক্তব্য বলবেন। এটিকে সমগ্র কাহিনীর মূল প্রতিবাদ্য বলা যেতে পারে।
একটি ভালো প্লটের বৈশিষ্ট:
ছোটগল্পে ‘সংঘাত’ প্লটের জীবন হিসেবে অভিহীত। গল্পের কাহিনীর মধ্যে যে ঘটনা বলা হয় ও যেসব চরিত্র সৃজন করা হয় সেগুলোর মধ্যে একটির সাথে আর একটির সংঘাত গল্পের মূল পরিণতির জন্য অবশ্যম্ভাবী। এই এ্যকশনগুলো না হলে কাহিনী অগ্রসর হতে পারে না। এই সংঘাতগুলোর কী পরিণতি হচ্ছে, চরিত্রগুলো তাদের অবস্থান থেকে আর কোথায় যাচ্ছে অথবা সমস্যা থেকে মুক্তি পাচ্ছে কি না তা জানতে পাঠক আগ্রহ নিয়ে থাকেন। লেখক সেগুলোকে ধারাবাহিকভাবে বর্ণনা করেন। গল্পের প্লট সমস্যা বা ঘটনার মধ্যে আবর্তিত হয়। ঘটনার আরোহণ সংঘাতের উপর ভিত্তি করে চলে ও কাহিনীকে গতিশীলতা এনে দেয়। এখানে চরিত্রগুলোর জীবনে নানান সংঘাত অথবা গল্পে বর্ণিত কাহিনীর সংঘাত প্রধান উপজীব্য।
একটি ভালো প্লট র্নিমাণের দক্ষতা সংঘাতগুলো সাজানোর উপর নির্ভর করে। এই সংঘাত দু’ভাবে হতে পারে: ১) কাহিনীর মূল ঘটনা বা কেন্দ্রীয় চরিত্রকে আবর্তিত করে অথবা ২) কাহিনীর মূল ঘটনা বা কেন্দ্রীয় চরিত্রকে যা বিরোধিতা করছে তাকে ঘিরে। তবে এই সংঘাতের মধ্যে কেন্দ্রীয় চরিত্র সবসময় পাঠকের সহানুভূতি পেয়ে থাকে। এটি অনেকটা গল্পে বর্ণিত নায়ক ও ভিলেনের মধ্যে সম্পর্কের মতো।
সংঘাত দু ধরনের হতে পারে: ১) বাহির হতে সংঘাত: যেখানে কেন্দ্রীয় চরিত্র বা অন্যান্য চরিত্রগুলোর নিজেদের কোনো হাত নেই এবং তা ঘটনা বা বিপরীত চরিত্র কর্তৃক আরোপিত। এখানে এই চরিত্রগুলো বাহির হতে আরোপিত সংঘাত থেকে মুক্তির পথ খোঁজে। সেজন্য সংগ্রাম করে। ২) অভ্যন্তরীণ সংঘাত: যেখানে কাহিনীর কেন্দ্রীয় চরিত্র বা চরিত্রগুলো নিজেদের মধ্যে এই সংঘাত তৈরি করে ও ঘটনাকে এগিয়ে নিয়ে যায়। এখানে চরিত্রগুলোর ভালোমন্দ লাগার অনুভূতি, বিশ্বাস, আশা-হতাশা, স্বপ্ন-স্বপ্নভঙ্গ ইত্যাদির বর্ণনা হতে পারে।
সফল প্লট নির্মাণের কৌশল:
একটি ভালো গল্পের মূল ভিত্তি প্লটের সফলতার উপর নির্ভর করে। বলা যায়, পাঠক একটি জমজমাট গল্প পড়ে যখন অভিভূত হন তখন এটিই প্রমাণীত হয় যে, লেখক খুব সফলভাবে কাজ করে সার্থক প্লট নির্মাণে দক্ষতা দেখিয়েছেন। সফল প্লট নির্মাণের কয়েকটি কৌশল আছে। যেমন: ক) সাসপেন্স বা অনিশ্চয়তা খ) পরিণতির পূর্বাভাস গ) অতীতের কথা বা স্মৃতিচারণ ঘ) গল্পের কাঠামো ঙ) অবাক করা সমাপ্তি।
ক) সাসপেন্স বা অনিশ্চয়তা: ছোটগল্প শুরু করতে হবে আকস্মিক একটি কথা বা ঘটনার সূত্রপাত দিয়ে যা পড়ে প্রথমে পাঠক চমৎকৃত হবেন ও গল্পের ভেতরে অজানা-অনিশ্চিত কী আছে তা জানার জন্য আগ্রহী হবেন। তাঁর ভেতরে গল্পের সম্পূর্ণ কাহিনী জানার জন্য একধরনের তাগিদ তৈরি হবে।
খ) পরিণতির পূর্বাভাস: পাঠককে এমন অনিশ্চিত, জটিল বা রহস্য আচ্ছন্ন কাহিনীতে নিয়ে যাওয়া যাবে না, যা থেকে তিনি বিরক্ত হন। গল্প হতে হবে তার চেনাজানা মানুষজন ও পরিবেশ থেকে। এ কথার অর্থ এই নয় যে, কল্পনা ও রহস্যের জগৎ থেকে কিছু লেখা যাবে না। বস্তুত লেখক গল্পের কাহিনীতে অতিরিক্ত ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে একই কথা ও বর্ণনা দেবেন না। গল্পের কাহিনীতে পাঠককে ধীরে ধীরে নিয়ে যেতে যেতে লেখক গল্পের একটি পরিণতির আভাস দেবেন। এটি ভালো গল্পের জন্য জরুরি এবং তা পাঠকের মনের আকাঙ্ক্ষাকে পরিপূর্ণ করে তোলে। লেখক গল্পের মাঝে মাঝে এমন কিছু ক্লু ছড়িয়ে দেবেন যা থেকে পাঠকের এই উপলব্ধি হয় যে, এটি তাঁর পরিচিত ভুবনের গল্প। তিনি অনুমান করতে পারেন যে, কাহিনীর পরবর্তী ধাপগুলো কী হতে যাচ্ছে।
গ) অতীতের কথা বা স্মৃতিচারণ: ছোটগল্পে এই কৌশলটি খুব সার্থকভাবে প্রয়োগ করা যায়। এখানে লেখক গল্পের সেই অংশটুকু বলতে পারেন যা কাহিনীর শুরুতে বলা হয়নি, কিন্তু কাহিনীকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য পুরোনো কথা বা ঘটনাগুলো বলা জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজকাল অনেক লেখক এই কৌশলটির সফল প্রয়োগ করেন যাতে পাঠকের মনে সেই পরিচিত মানুষজন আর ঘটনার বাস্তবতা দেখা যায়। এটি মূলত গল্পের প্লটের সেই পরিচিত অংশ যা পুরো কাহিনীর গতিময়তা দিয়ে থাকে।
ঘ) গল্পের কাঠামো: এটি হলো গল্পের ভেতরের গল্প অর্থাৎ লেখক যে গল্প বলতে শুরু করেছেন এবং সেজন্য নানান চরিত্র নির্মাণ করেছেন, সেই চরিত্রগুলোর নিজস্ব গল্প আছে আর সেসবের সুবিন্যস্ত উপস্থাপনা হলো গল্পের কাঠামো। ভালো প্লট একটি গল্পের কাঠামো ছাড়া তৈরি করা যায় না। এখানে লেখক গল্পের চরিত্র নির্মাণ ছাড়াও কল্পনাশক্তি, আশা-আকাঙ্ক্ষা-স্বপ্ন-ব্যর্থতা, পরিবেশ ও আমেজ নির্মাণ করে গল্পকে এগিয়ে নিয়ে থাকেন।
ঙ) অবাক করা সমাপ্তি: লেখক যে আকস্মিক ও আকর্ষণীয় বাক্য নিয়ে গল্পের সূত্রপাত করেছেন তার সমাপ্তিও টেনে দেবেন এক আকস্মিক সমাপ্তি দিয়ে, যা হয়তো পাঠকের কাছে বিস্মিত এক পরিণতির মতো লাগে। সতর্ক পাঠক এমন একটি সমাপ্তির প্রত্যাশা করেন।
২) চরিত্র (Character):
ছোটগল্পে যে কেন্দ্রীয় চরিত্র থাকে তা অন্যান্য পার্শ্ব চরিত্রগুলো অপেক্ষা অনেক পরিস্ফুট ও স্বচ্ছ। মূলত গল্পের কাহিনী ও বর্ণনা তাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। এখানে লেখক সেই চরিত্রের পেছনের কথা ও বর্তমানের কথা বলেন। তার ভাবনা, উপলব্ধি, স্বপ্ন-সাধ, আশা-হতাশা, অভ্যাস, মনমানসিকতা, ব্যক্তিত্ব ইত্যাদি বিষয়গুলো গল্পের নিরিখে যেমন প্রযোজ্য তেমনভাবে লিখে থাকেন। একটি-দুটি কথাতে বা ঘটনাতে লেখক এই চরিত্রটির সার্বিক প্রতিচ্ছবি আঁকতে পারেন। অন্যান্য পার্শ্ব ও লঘু চরিত্রগুলোর কথা বাদ দেয়া যায় না, তবে তা কেন্দ্রীয় চরিত্রের মতো বিশদ নাও হতে পারে। লেখক যে চরিত্র সৃজন করেন ছোটগল্পের ক্ষেত্রে তাকে চরিত্রায়ন বলা যায়। লেখক সাধারণত দুটি মৌলিক কৌশল অনুসরনের দ্বারা চরিত্রায়ন বা চরিত্র সৃজন করে থাকেন। ১) সরাসরি চরিত্রের কথা বলা ২) ঘটনা বা চরিত্রের ভাবনা, উপলব্ধি, স্বপ্ন-সাধ, আশা-হতাশা, অভ্যাস, মনমানসিকতা ইত্যাদির মাধ্যমে পাঠকের কাছে চরিত্রটির মূর্ত রূপ তুলে ধরা।
গল্পের চরিত্র কাহিনীর প্রয়োজনে নানারকমের হতে পারে। লেখক নিজেই সৃষ্টি করেন তার কাহিনীর নায়ক-নায়িকা-ভিলেন-সহযোগিগণ কেমন মানুষ হবে। তারা কি পরিচিত ভূবনের নাকি কল্পনার জগতের? মূলত সফল গল্পের প্রয়োজনে পরিচিত ও বাস্তব বা বাস্তবের মতো চরিত্র সৃজন করা জরুরি। এই চরিত্রগুলোর মধ্যে নানান ঘটনা, সংঘাত, মিল-অমিল গল্পের কাহিনীকে এগিয়ে নিয়ে যায় ও একটি পরিণতি দিয়ে থাকে। এক্ষেত্রে লেখকের অভিজ্ঞতা ও কল্পনাশক্তি অনেক কাজ করে থাকে। লেখক তার কাহিনীর প্লট অনুসারে চরিত্রের প্রতিচ্ছবিকে নানাভাবে মূর্ত করে তোলেন। যেমন:
১) প্রধান বা কেন্দ্রীয় চরিত্র: এই চরিত্রটি সমগ্র গল্পে একটি বিশেষ ও স্বতন্ত্র ভূমিকা নিয়ে এগোবে। তার কথাবার্তা ঘটনা সংঘটন ইত্যাদিতে একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট প্রকাশ পাবে। এই চরিত্রটি গল্পের কাহিনীর উদ্দেশ্য ও পরিণতিতে বড় ও মূল ভূমিকা রাখে।
২) পারিপার্শ্বক চরিত্র: এই চরিত্র বা চরিত্রগুলো গল্পের কাহিনীর বিস্তৃতির জন্য প্রয়োজনীয় কিন্তু তার বা তাদের অবস্থান ও ঘটনা প্রবাহ গল্পে অনেকটা অতিথির মতো। তাদের ভূমিকা গোলাপ প্রস্ফুটিত হওয়ার পেছনে গাছকে মাটির রসে সঞ্জীবিত করার মতো নেপথ্য শক্তি। পাঠক তাদের সঙ্গে তুলনামূলকভাবে ‘কম’ পরিচিত হন, তাদের সীমিতভাবে দেখেন ও শোনেন কিন্তু কাহিনীর এগিয়ে যাওয়ার জন্য তাদের ভূমিকা অনেক বেশি ও জরুরি।
৩) সরল ও অপরিবর্তনীয় চরিত্র: গল্পে এ চরিত্রগুলোর অবস্থান এক মতো অর্থাৎ পাঠকের মনে তাদের একই ধাঁচ ও ছবি ফুটে উঠে।
৪) পরিবর্তনশীল চরিত্র: এই চরিত্রগুলো বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ঘটনার মাধ্যমে একক ব্যক্তিত্ব বা চরিত্র রূপলাভ করে থাকে।
৫) নিশ্চল বা স্থির চরিত্র: এ চরিত্রটির বৈশিষ্ট হলো এগুলো গল্পের মধ্যে পরিবর্তিত হয় না। নিশ্চল একটি ভূমিকা নিয়ে থাকে।
৬) গতিময় চরিত্র: এ চরিত্রটি গল্পের কাহিনীর মধ্যে বিভিন্ন ঘটনার সূত্রপাত করে গল্পকে গতিশীল করে থাকে।
৭) স্টিরিওটাইপড্ বা ছাঁচে ঢালা চরিত্র: এ চরিত্রগুলো আমাদের অতি জানাশোনা ও পরিচিত ব্যক্তি যাদের আগমন, আচরণ খুব চেনা ও আগাম বলে দেয়া যায় যে, তারা কী করবে।
লেখক তার গল্পের কাহিনীর প্রয়োজন অনুসারে চরিত্রগুলোর সমাবেশ করেন। তাদের দ্বারা নানান কথা বলান, ঘটনা ঘটান এবং গল্পকে সমাপ্তির দিকে নিয়ে যান। এই চরিত্রগুলো কখনো সরাসরি বা প্রত্যক্ষ আবার কখনো প্রচ্ছন্ন বা পরোক্ষভাবে উপস্থাপিত হয়। যেমন: আমরা যদি অধ্যাপকের একটি চরিত্র উপস্থাপন করতে চাই, তখন সরাসরি বা প্রত্যক্ষভাবে বলতে পারি, তিনি একজন অধ্যাপক, কলেজে শিক্ষকতা করেন। আবার পরোক্ষভাবে যদি দেখানো যায় যে, তিনি কলেজের ক্লাসে পড়াচ্ছেন তাহলে সহজে বোঝা যায় যে চরিত্রটি কলেজের শিক্ষক বা অধ্যাপক।
৩) সেটিং (Setting):
গল্পের কাহিনীতে যে সময় ও স্থানের কথা বলা হয় অর্থাৎ ঘটনাটি কোন্ জায়গার এবং সময়ের সেটিকে গল্পের সেটিং বলা যায়। স্পষ্টভাবে বলতে গেলে গল্পের কাহিনী অমুক জায়গায় অমুক সময়ে ঘটেছে বা ঘটছে, এমন একটি প্রেক্ষাপটকে গল্পের সেটিং বলে। সাধারণত লেখক কাহিনীর বাস্তবতার আবহ তৈরি করতে জায়গা ও সময়ের বর্ণনা করে থাকেন। গল্পের মধ্যে যদি বলা হয়, ফুটবল খেলার মাঠ, সময় বিকেলবেলা এবং ঝিপঝিপ করে বৃষ্টি হচ্ছে, তাহলে পাঠকের মনে ঠিক অনুরূপ একটি ছবি ভেসে উঠে। এই সেটিং’এর উপর চরিত্রগুলোর নানান ভূমিকা, ঘটনাপ্রবাহ, ধারনা, দ্বন্দ্ব-সংঘাত ইত্যাদি বিষয়গুলো স্পষ্ট হয়ে উঠে, তেমনভাবে বাস্তবানুগ মনে হয় এবং গল্প এগিয়ে চলে। পাঠক প্রথমেই এই সেটিং’কে ধরে গল্পের ভেতরে প্রবেশ করেন এবং ধীরে ধীরে মিশে যান। মূলত সেটিং’এর মাধ্যমে লেখক তার কাহিনীকে দৃশ্যমান করার সুযোগ লাভ করেন। কোনো কোনো লেখক সেটিং’কে ক্রমানুসারে ধীরে ধীরে উপস্থাপন করেন, প্রয়োজন মতো জমিয়ে বিবরণ দেন আবার কোনো কোনো লেখক খুব বেশি প্রাধান্য না দিয়ে চরিত্রগুলোর মাধ্যমে গল্পের সেটিংস কাহিনীতে তুলে ধরেন। তবে যেভাবেই হোক না কেন গল্পে সেটিং আবশ্যক।
কয়েকটি পদ্ধতিতে সেটিং গড়ে তোলা বা উপস্থাপন করা যায়। যেমন: ১) ডায়লগ: গল্পের চরিত্র বা চরিত্রগুলোর কথার মাধ্যমে সেটিং তুলে ধরা যায়। দৃষ্টান্ত: একটি চরিত্র আর এক চরিত্রকে উদ্বেগের সাথে বলছে, এতরাতে না গেলেই কি নয়? ২) শব্দের মাধ্যমে সেটিং তুলে ধরা যায়। দৃষ্টান্ত: দূর হতে ভেসে আসা ট্রেনের হুইসিলের শব্দে বোঝা যায় একটি ট্রেন কিছুক্ষণ পর চলে যাবে এবং জায়গাটা রেল ইস্টিশান বা লাইনের কাছাকাছি। গন্ধের বর্ণনা দিয়ে। দৃষ্টান্ত: তরকারি পোড়ার গন্ধের কথা দিয়ে লেখক রান্নাঘরের ছবি আঁকতে পারেন।
পাঠক গল্পের কাহিনীতে সেটিং’কে ধরে এগিয়ে যান কেননা মানুষের স্বভাব, ভিন্নতা, বসবাস, ভাবনা, মূল্যবোধ, বিশ্বাস, ঐতিহ্য, পেশা, পরিবেশ, পরিস্থিতি, জীবন প্রবাহ ও জটিলতা ইত্যাদির সাথে তাদের সংশ্লিষ্টতা ও অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং তারা গল্পের মধ্যে সেটিকে দেখতে পছন্দ করেন। গল্পের মধ্যে চরিত্রগুলোর ভাবনা ও এ্যকশন সেটিং’এর দ্বারা প্রভাবিত হয় অথবা উল্টোটিও হতে পারে যে, তাদের ওই সমস্ত ভাবনা ও এ্যকশন সেটিং তৈরি করছে। এটি কিভাবে সাধিত হয়, একটু দেখা যাক। ১) সময়: গল্পের কাহিনীতে বর্ণিত সময় গল্পের পুরো প্লটকে প্রভাবিত করে। দৃষ্টান্ত: গভীর রাতে গল্পের চরিত্র এক ভুতুড়ে বাড়িতে এসেছে। এখানে পাঠকের মনে ভয় মিশ্রিত এক কৌতূহলের সৃষ্টি করে। ২) জায়গা বা স্থান: গল্পের কাহিনীকে এটিও প্রভাবিত করে। দৃষ্টান্ত: যানজটপূর্ণ সড়কের উল্লেখ করলে আমরা খুব সহজেই সেই দৃশ্যটি চোখে ভেসে উঠতে দেখি। ৩) ঘটনা: ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন ঘটনার সংঘটন সেটিং বুঝতে সহায়তা করে। যেমন: চলন্ত বাস থেকে এক যাত্রী লাফ দিয়ে নেমে গেল।
৪) থীম (Theme):
একটি সার্থক ছোটগল্প তা সিরিয়াস বা সাধারণভাবে ভালো লেখা হলেও অবশ্যই সুখপাঠ্য। কেননা এটি মানুষের জীবন ও জগতের কথা বলে। পাঠক গল্পের কাহিনীতে বিধৃত ঘটনা, ঘটনার পেছনের ঘটনা, চরিত্র ও চরিত্রগুলোর বিভিন্ন এ্যকশন পড়েন এবং তাঁর নিজের বিশ্বাস ও মূল্যবোধ, বিচার-বিবেচনা, জানাশোনা, দেখা বা অভিজ্ঞতার সাথে জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে মিলিয়ে নেন। মূলত জীবনের এই বিষয়টি যা গল্পে লেখা হয় সেটিই গল্পের থীম। পাঠক গল্প শেষ করার পর এটি বুঝতে পারেন যে, মূলত এই বক্তব্য বা আমেজ সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই গল্পটি। তবে অধিকাংশ ছোটগল্পে গল্পের থীম সরাসরি বলা হয় না। এখানে পাঠক পড়া শেষে নিজেই সেটি তৈরি করে নেন। তিনি তাঁর ধী শক্তি বলে বক্তব্যটির একটি ছবি এঁকে নেন এবং সাধারণভাবে একটি উপসংহার বা সমাপ্তিতে আসেন। লেখক তার গল্পের থীম বেশ কিছু পদ্ধতিতে প্রকাশ করতে পারেন। ১) সরাসরি গল্পের শিরোনাম বা পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণের মাধ্যমে মুল বক্তব্য সম্পর্কে আভাষ দিয়ে। ২) গল্পের ভেতর কোনো একটি অংশে চরিত্রের অভিজ্ঞতা বর্ণনার মধ্য দিয়ে। ৩) গল্পের চরিত্রের কোনো উক্তি দিয়ে।
উপরোক্ত বিষয়গুলো ছাড়াও ছোটগল্পের ক্ষেত্রে আরও কিছু বিষয় যথেষ্ট মনোযোগের দাবি রাখে। যেমন:
১) গল্পের একটি আকর্ষণীয় শিরোনাম একটি সম্পদ। এ কথাকে সামনে রেখে গল্পের শিরোনাম ঠিক করতে হয়। এটি হবে ছোট, আকর্ষণীয়, বিষয় ও থীম সংশ্লিষ্ট। অর্থাৎ গল্পটি যদি মঙ্গল গ্রহে অভিযান সম্পর্কিত হয় তাহলে ‘মঙ্গল গ্রহে অভিযান’ হতে পারে। যদি কোনো চরিত্রের বধু খোঁজা নিয়ে কৌতুক বা রম্য গল্প হয় তাহলে ‘বধু অন্বেষণ’ ইত্যাদি দেয়া যেতে পারে। শিরোনাম দেয়ার ক্ষেত্রে লেখকের দক্ষতা সবচেয়ে গরুত্বপূর্ণ। এমন শিরোনাম দেয়া উচিৎ যা শুধু আকর্ষণীয় হবে না, উপযুক্ত শব্দচয়ন ও বিন্যাসনির্ভর যা পাঠকের মনে কৌতূহল জাগাবে। শিরোনাম কখনোই দীর্ঘ ও অপ্রাসঙ্গিক হবে না। বলা হয়ে থাকে একটি ভালো শিরোনাম গল্পকে মূল্যবান করে তোলে।
২) লেখার বিষয়ে নির্ভুল বানান, সঠিক শব্দচয়ন ও মার্জিত বাক্যের ধারাবাহিকতা সুসামঞ্জস্যপূর্ণ করা শ্রেয়। খাপছাড়া ও অপ্রাসঙ্গিক বক্তব্যের বাহুল্য বর্জন করতে হবে। অনুরূপভাবে রিপিটেশন করাও বর্জনীয়।
৩) গল্পের আকার হতে হবে সহনীয় পর্যায়ের। তবে এক্ষেত্রে নানাজনের ভিন্ন ভিন্ন কথা রয়েছে। কেউ ছোটগল্পকে ১৫০০ থেকে ৩০০০ শব্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ করতে চান। কেউ কেউ আবার বলে থাকেন যে, ছোটগল্প আকারে হবে ৩০০০ থেকে ৪০০০ শব্দের মধ্যে, কিন্তু কোনোক্রমেই ৩৬০০ থেকে ৪৩০০ শব্দের অতিরিক্তি হবে না। আবার এটাও দেখা যায় যে, কোনো কোনো ছোটগল্প মলাটবদ্ধ বইয়ের পৌণে একপৃষ্ঠায় লেখা হয়েছে। কেউ কেউ এগুলোকে অনুগল্প বলে থাকেন। দেখা যায়, লেখক ছোটগল্প রচনায় তার পরিধির বিষয়ে পূর্ণ স্বাধীনতা আদায় করে নেন। তবে যারা সংবাদপত্রে ছোটগল্প লিখতে আগ্রহী তাদের উচিৎ হবে একটি ছোটগল্পের আকার ১৫০০ থেকে ১৮০০ শব্দের মধ্যে সীমিত রাখতে।
৪) গল্পে বর্ণিত বিভিন্ন প্রেক্ষাপট, চরিত্রগুলোর বাস্তবতা যুক্তিযুক্ত করা উচিৎ। যে তথ্য ও তত্ত্ব গল্পে এসে যায় তা সঠিক হতে হবে। কেননা পাঠক আজগুবি বা ভুল তথ্য দ্বারা বিরক্ত হন। তেমনভাবে কোনো জ্ঞান দেখানো ও সেকেন্ড হ্যান্ড ইনফরমেশন দেয়ার চেষ্টা করা যাবে না।
৫) গল্পের কাহিনীতে নানান মিশ্র থীমের সমাবেশ না ঘটানোই শ্রেয়। একটি বক্তব্য একটি গল্পের জন্য যথেষ্ট। প্রয়োজনে ভিন্ন থীমের জন্য ভিন্ন গল্প লেখা যেতে পারে। গল্পে মূল বক্তব্যের বারবার উল্লেখ পরিহার করা দরকার। আবার ভাষার নানান কারুকাজ দেখাতে গিয়ে যেন দুর্বোধ্য বা প্রবন্ধের মতো কঠোর না হয়, সেটি লক্ষ্য রাখতে হবে।
ছোটগল্প সাহিত্যের একটি অতি মূল্যবান অংশ। এর সম্ভাবনা ও পাঠক অনেক। ছোটগল্প শুরু থেকে অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষার পথ পেরিয়ে চলেছে। এখন কোনো ফর্মুলায় ফেলে হয়তো ছোটগল্পের জ্যামিতি খোঁজা যায় না। তারপরও একটি কাঠামোকে লেখকগণ অনুসরণ করে থাকেন। তাঁরা স্ব-স্ব দক্ষতা, পছন্দ, লেখার স্টাইল ধরে ছোটগল্প পাঠকদের উপহার দিয়ে চলেছেন।
মূল লেখক:
জনাব মাহবুব আলী।
সোমবার, ২ জুন, ২০১৪
লোডশেডিং
গিন্নির হাতে বানানো পান মুখে দিতে দিতে কর্তা বাবু বললো, “লোডশেডিং যেভাবে দিন দিন বাড়ছে তাতে তো সিদ্ধ হয়ে মরতে হবে অতি শীগ্রই, অতিষ্ট হয়ে পড়েছি, আরতো পারি না। ” কর্তা বাবুর কথা শুনে গিন্নির মুখে একটা স্পস্ট দুঃশ্চিন্তা ছাপ দেখে সাথে সাথে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়লো হরিপদ। মনে মনে ভাবতে লাগলো এই লোডশেডিং টা কি, যা কর্তা বাবুর মত বড় মানুষকে সিদ্ধ করে দিতে পারে? কর্তা বাবুকেই জিজ্ঞাসা করবে এই “লোডশেডিং” টা কে, কি অথবা আসলো কোথা থেকে? কর্তা বাবুকে প্রশ্ন করতে যেই না মুখ হা করলো হরিপদ, তখনি মনে পরে গেল দিনের প্রারম্ভে কর্তা বাবুর সতর্কবাণী। আজ সকালে কর্তা বাবুকে যখন হরিপদ জিজ্ঞাসা করেছিলো, ” কর্তা, সুবল বললো আগামী শুক্রবার নাকি পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে?” তখনই কর্তা তাকে জানিয়ে দিয়েছিলেন, আজকে দিনে আর একটা প্রশ্ন করলে নূতন কিনে আনা ছাতাতে তার মেরুদন্ড ভাঙ্গা হবে। মেরুদন্ড বাঁচাতে গিয়ে আর কোনো প্রশ্নই করলো না হরিপদ। বের হয়ে এলো কর্তা বাবুর জমিদার বাড়ি থেকে।
গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে হরিপদ হেঁটে চলছে আর ভাবছে, ছোট কালে পিতা মারা যাওয়ার পর এই কর্তা বাবুর বাড়িতেই বড় হয়েছে, কর্তা বাবু তার পিঠে যতই ছাতা ভাঙ্গুক না কেন আহার দিয়েছে ঠিক তিন বেলাই। এখন এই কর্তা বাবু যদি লোডশেডিং এর কবলে পরে সিদ্ধ হয়ে যায় তাহলে তাকে কে আশ্রয় দিবে। দু’কূলে তার কেউই নেই এই কর্তা ছাড়া। ভাবনার অতলে হারিয়ে গেছে হরিপদ।
হরিপদের কাছে হঠাৎ রীতিমত দৌড়ে আসলো সুবল দাস। সুবল দাস হলো হরিপদের একমাত্র বন্ধু। পাশাপাশিই বাড়ি তাদের। দূর থেকে বার কয়েক ডেকে জবাব না পওয়াতে সে দৌড়ে এসেই ধরলো হরিপদকে।
সুবল : “আরে এই হরিপদ, তোরে সেই কতক্ষণ ধরে ডাকছি, কি এমন ভাবছিস যে এত বার পিছন থেকে ডাকার পরও তোর কানে ডাক পৌঁছেনি?”
হরিপদ : ডেকেছিস নাকি? কই শুনতে পাইনি’তো আমি। শুনতে পেলে কি আর থামতাম না বল?
সুবল: এভাবে চিৎকার করে ডাকলাম তারপরও শুনতে পেলি না? নিশ্চই কোনো গভীর ভাবনা ভাবছিলি। কোথা থেকে এলি তুই আর যাচ্ছিস কোথায়?
হরিপদ: এসেছি কর্তা বাড়ি থেকে আর যাচ্ছি একটু রাজমণির বাড়ির দিকে। রাজমণির মায়ের অসুখ তাই আমাকে বলেছিলো কিছু ঔষধ এনে দিতে। কেন ডেকেছিস তুই?
সুবল: আরে আজ রাতে যাত্রা হবে, তোকে নিয়ে রাতে যাত্রা দেখতে যাবো ভাবছি।
হরিপদ: দ্যাঁখ সুবল, কর্তা বাবু যদি শুনে যাত্রা দেখতে গেছি আমি তাহলে নিশ্চিত তার ছাতা আমার পিঠে ভাঙ্গবে। তুই যা আমার দেরী হলে আবার কর্তা চটে যাবে।
এই বলে হরিপদ হাঁটা শুরু করলো। পিছন থেকে সুবল দাস একটু জোর গলায় বললো, “আরে এই হরিপদ যদি যাস তাহলে চলে আসিস।”
হরিপদ একবার পিছনে তাকিয়ে দেখে সুবল হাঁটা শুরু করেছে উল্টোদিকে। দু’কদম সামনে এগিয়েই হঠাৎ হরিপদ থেমে গেলো। পিছনে ফিরে দৌড়ে আসলো সুবল দাসের কাছে। বললো,
হরিপদ: হ্যাঁ সুবল তুই কি সত্যিই আমাকে জোরে জোরে ডেকেছিলি তখন?
সুবল: হ্যাঁ, কেন, তোর বিশ্বাস হয়না? আমি কি মিথ্যে বলেছি নাকি তোর সাথে? ছি, ছি শেষ পর্যন্ত তুই আমারে মিথ্যুক বানালি? কর্তা বাবুর বাড়িতে থাকস বলে কি এখন আমাদের মত গরীবদের কথা তোর বিশ্বাস হয় না’রে হরিপদ?
হরিপদ: আরে না না, কি আজে বাজে কথা শুরু করলি, তোরে আমি মিথ্যুক ভাববো কেন?
সুবল: ঠিকই বলেছিস আমার কথা এখন তোর আজে বাজেই মনে হবে।
হরিপদ: আরে না, কথা শুন প্রথমে। আমি ভাবলাম তুই এতো জোরে ডাকলি কিন্তু আমি শুনতে পেলাম না কেন? আমারও কি তাহলে লোডশেডিং বেড়ে গেলো নাকি?
সুবল: লোডশেডিং!! এই হরিপদ তুই এসব কি কস? এই নামতো জীবনে শুনিনাই।
হরিপদ: কর্তা বাবুর কাছে আজকে শুনেছি, এই লোডশেডিং দিন দিন নাকি বাড়ছে আমাদের দেশে, এটা মানুষকে সিদ্ধ করে ফেলে। কর্তা বাবুও এটা নিয়ে অনেক দুঃশ্চিন্তার মাঝে আছে। ভগবান জানে এখন আমাদের কি হবে। আচ্ছা সুবল, তুই কি কিছু জানিস এই ব্যাপারে?
এই কথা শুনে সুবল একটু আতঙ্কিত হয়ে পরল। গলায় তার কাপুনি ধরেছে। কাঁপতে কাঁপতে বললো,
সুবল: কি কস! এতো দেখি খুব ভয়ংকর কথা রে। আমি জানবো কোথা থেকে? তুই কেন জিজ্ঞাসা করলি না তোর কর্তাকে?
হরিপদ : আরে করতাম আমি কিন্তু সকালে কর্তা বাবু বলেছিলো আজকে কিছু জিজ্ঞাসা করলে নূতন ছাতাটা দিয়ে আমার মেরুদন্ড ভাঙ্গবে।
সুবল: আরে না, আগামী ছয় মাস আর কোনো ছাতার বারি খাওয়ার সম্ভাবনা নেই। তুই নিশ্চিন্তে থাক হরিপদ। কর্তা বাবু হয়তো এমনি বলেছে, নূতন ছাতা দিয়ে তোকে মারতে এসে তার ছাতা সে নষ্ট করবে না। ধনীদের কাছে গরীবের মেরুদন্ডের চেয়ে তার নূতন ছাতার মূল্য অনেক বেশি।
হরিপদ: তা ঠিকই বলেছিস তুই সুবল। এর চেয়ে ভাল হবে চল মহাজনের কাছে যাই। উনি বলতে পারবেন আসল ঘটনা কি। কত মানুষের সাথেইতো তার চলাফেরা রয়েছে। আর সেখানে গেলে একটা উপায়ও বেরিয়ে আসবে।
সুবল: হ্যাঁ, যাওয়া যায় খারাপ না কিন্তু মহাজন কি আমাদের কথা শুনবেন? উনিতো খুব বড় মানুষ।
সুবল দাসের কথা শুনে হরিপদের চোখগুলো বড় হয়ে গেলো।
হরিপদ: কি বলিস তুই? উনি আবার বড় মানুষ হলো কবে? তাহলেতো আর তাকে পাওয়া যাবে না।
সুবল: কেন?
হরিপদ: কেন কি? তুই জানিস না, মানুষ বড় হলে তাদেরকে আর পাওয়া যায় না? কেন নারায়ণ চক্রবর্তীর কথা কি ভুলে গেলি? সেই যে ইলেকশনে জিতার পর শহরে গেছে আর কি ফিরে আসছিলো? বড় মানুষ তারাই যাদেরকে দেখা যায় কর্তা বাবুর টেলিভিশনে।
সুবল: তা তুই ঠিকই বলেছিস। এক কাজ কর রাতে কর্তার বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে চল দুজনে মিলে যাত্রা দেখার আগে মহাজনের কাছে যাবো।
হরিপদ : আরে তুই আছিস শুধু তোর যাত্রা নিয়ে, এই দিকে আমিতো ধীরে ধীরে সিদ্ধ হতে শুরু করেছি। আচ্ছা এখন আমি আগে রাজমণির মা’য়ের ঔষধ কিনে দিয়ে আসি। রাতে কর্তা বাবুর বাড়ি থেকে এসে চিন্তা করবো কি করা যায়।
এই বলে সুবল দাসকে বিদায় জানিয়ে হরিপদ রাজমণির বাড়ির দিকে হাঁটা শুরু করলো। সন্ধ্যাও ঘনিয়ে আসছে সাথে তার ভাবনার ঘনত্ব বাড়ছে। হঠাৎ ভাবতে লাগলো রাজমণির মায়ের অসুখের কথা। দুপুরে রাজমণি শুধু বলেছিলো তার মায়ের অসুখ কিন্তু কি অসুখ সেটা বলেনি। তার মা’য়ের আবার লোডশেডিং হয়নিতো? এই ভাবনা তার মনে আসার সাথে সাথে প্রায় বিদ্যুৎ গতিতেই ছুটে চললো রাজমণির বাড়ির দিকে।
গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে হরিপদ হেঁটে চলছে আর ভাবছে, ছোট কালে পিতা মারা যাওয়ার পর এই কর্তা বাবুর বাড়িতেই বড় হয়েছে, কর্তা বাবু তার পিঠে যতই ছাতা ভাঙ্গুক না কেন আহার দিয়েছে ঠিক তিন বেলাই। এখন এই কর্তা বাবু যদি লোডশেডিং এর কবলে পরে সিদ্ধ হয়ে যায় তাহলে তাকে কে আশ্রয় দিবে। দু’কূলে তার কেউই নেই এই কর্তা ছাড়া। ভাবনার অতলে হারিয়ে গেছে হরিপদ।
হরিপদের কাছে হঠাৎ রীতিমত দৌড়ে আসলো সুবল দাস। সুবল দাস হলো হরিপদের একমাত্র বন্ধু। পাশাপাশিই বাড়ি তাদের। দূর থেকে বার কয়েক ডেকে জবাব না পওয়াতে সে দৌড়ে এসেই ধরলো হরিপদকে।
সুবল : “আরে এই হরিপদ, তোরে সেই কতক্ষণ ধরে ডাকছি, কি এমন ভাবছিস যে এত বার পিছন থেকে ডাকার পরও তোর কানে ডাক পৌঁছেনি?”
হরিপদ : ডেকেছিস নাকি? কই শুনতে পাইনি’তো আমি। শুনতে পেলে কি আর থামতাম না বল?
সুবল: এভাবে চিৎকার করে ডাকলাম তারপরও শুনতে পেলি না? নিশ্চই কোনো গভীর ভাবনা ভাবছিলি। কোথা থেকে এলি তুই আর যাচ্ছিস কোথায়?
হরিপদ: এসেছি কর্তা বাড়ি থেকে আর যাচ্ছি একটু রাজমণির বাড়ির দিকে। রাজমণির মায়ের অসুখ তাই আমাকে বলেছিলো কিছু ঔষধ এনে দিতে। কেন ডেকেছিস তুই?
সুবল: আরে আজ রাতে যাত্রা হবে, তোকে নিয়ে রাতে যাত্রা দেখতে যাবো ভাবছি।
হরিপদ: দ্যাঁখ সুবল, কর্তা বাবু যদি শুনে যাত্রা দেখতে গেছি আমি তাহলে নিশ্চিত তার ছাতা আমার পিঠে ভাঙ্গবে। তুই যা আমার দেরী হলে আবার কর্তা চটে যাবে।
এই বলে হরিপদ হাঁটা শুরু করলো। পিছন থেকে সুবল দাস একটু জোর গলায় বললো, “আরে এই হরিপদ যদি যাস তাহলে চলে আসিস।”
হরিপদ একবার পিছনে তাকিয়ে দেখে সুবল হাঁটা শুরু করেছে উল্টোদিকে। দু’কদম সামনে এগিয়েই হঠাৎ হরিপদ থেমে গেলো। পিছনে ফিরে দৌড়ে আসলো সুবল দাসের কাছে। বললো,
হরিপদ: হ্যাঁ সুবল তুই কি সত্যিই আমাকে জোরে জোরে ডেকেছিলি তখন?
সুবল: হ্যাঁ, কেন, তোর বিশ্বাস হয়না? আমি কি মিথ্যে বলেছি নাকি তোর সাথে? ছি, ছি শেষ পর্যন্ত তুই আমারে মিথ্যুক বানালি? কর্তা বাবুর বাড়িতে থাকস বলে কি এখন আমাদের মত গরীবদের কথা তোর বিশ্বাস হয় না’রে হরিপদ?
হরিপদ: আরে না না, কি আজে বাজে কথা শুরু করলি, তোরে আমি মিথ্যুক ভাববো কেন?
সুবল: ঠিকই বলেছিস আমার কথা এখন তোর আজে বাজেই মনে হবে।
হরিপদ: আরে না, কথা শুন প্রথমে। আমি ভাবলাম তুই এতো জোরে ডাকলি কিন্তু আমি শুনতে পেলাম না কেন? আমারও কি তাহলে লোডশেডিং বেড়ে গেলো নাকি?
সুবল: লোডশেডিং!! এই হরিপদ তুই এসব কি কস? এই নামতো জীবনে শুনিনাই।
হরিপদ: কর্তা বাবুর কাছে আজকে শুনেছি, এই লোডশেডিং দিন দিন নাকি বাড়ছে আমাদের দেশে, এটা মানুষকে সিদ্ধ করে ফেলে। কর্তা বাবুও এটা নিয়ে অনেক দুঃশ্চিন্তার মাঝে আছে। ভগবান জানে এখন আমাদের কি হবে। আচ্ছা সুবল, তুই কি কিছু জানিস এই ব্যাপারে?
এই কথা শুনে সুবল একটু আতঙ্কিত হয়ে পরল। গলায় তার কাপুনি ধরেছে। কাঁপতে কাঁপতে বললো,
সুবল: কি কস! এতো দেখি খুব ভয়ংকর কথা রে। আমি জানবো কোথা থেকে? তুই কেন জিজ্ঞাসা করলি না তোর কর্তাকে?
হরিপদ : আরে করতাম আমি কিন্তু সকালে কর্তা বাবু বলেছিলো আজকে কিছু জিজ্ঞাসা করলে নূতন ছাতাটা দিয়ে আমার মেরুদন্ড ভাঙ্গবে।
সুবল: আরে না, আগামী ছয় মাস আর কোনো ছাতার বারি খাওয়ার সম্ভাবনা নেই। তুই নিশ্চিন্তে থাক হরিপদ। কর্তা বাবু হয়তো এমনি বলেছে, নূতন ছাতা দিয়ে তোকে মারতে এসে তার ছাতা সে নষ্ট করবে না। ধনীদের কাছে গরীবের মেরুদন্ডের চেয়ে তার নূতন ছাতার মূল্য অনেক বেশি।
হরিপদ: তা ঠিকই বলেছিস তুই সুবল। এর চেয়ে ভাল হবে চল মহাজনের কাছে যাই। উনি বলতে পারবেন আসল ঘটনা কি। কত মানুষের সাথেইতো তার চলাফেরা রয়েছে। আর সেখানে গেলে একটা উপায়ও বেরিয়ে আসবে।
সুবল: হ্যাঁ, যাওয়া যায় খারাপ না কিন্তু মহাজন কি আমাদের কথা শুনবেন? উনিতো খুব বড় মানুষ।
সুবল দাসের কথা শুনে হরিপদের চোখগুলো বড় হয়ে গেলো।
হরিপদ: কি বলিস তুই? উনি আবার বড় মানুষ হলো কবে? তাহলেতো আর তাকে পাওয়া যাবে না।
সুবল: কেন?
হরিপদ: কেন কি? তুই জানিস না, মানুষ বড় হলে তাদেরকে আর পাওয়া যায় না? কেন নারায়ণ চক্রবর্তীর কথা কি ভুলে গেলি? সেই যে ইলেকশনে জিতার পর শহরে গেছে আর কি ফিরে আসছিলো? বড় মানুষ তারাই যাদেরকে দেখা যায় কর্তা বাবুর টেলিভিশনে।
সুবল: তা তুই ঠিকই বলেছিস। এক কাজ কর রাতে কর্তার বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে চল দুজনে মিলে যাত্রা দেখার আগে মহাজনের কাছে যাবো।
হরিপদ : আরে তুই আছিস শুধু তোর যাত্রা নিয়ে, এই দিকে আমিতো ধীরে ধীরে সিদ্ধ হতে শুরু করেছি। আচ্ছা এখন আমি আগে রাজমণির মা’য়ের ঔষধ কিনে দিয়ে আসি। রাতে কর্তা বাবুর বাড়ি থেকে এসে চিন্তা করবো কি করা যায়।
এই বলে সুবল দাসকে বিদায় জানিয়ে হরিপদ রাজমণির বাড়ির দিকে হাঁটা শুরু করলো। সন্ধ্যাও ঘনিয়ে আসছে সাথে তার ভাবনার ঘনত্ব বাড়ছে। হঠাৎ ভাবতে লাগলো রাজমণির মায়ের অসুখের কথা। দুপুরে রাজমণি শুধু বলেছিলো তার মায়ের অসুখ কিন্তু কি অসুখ সেটা বলেনি। তার মা’য়ের আবার লোডশেডিং হয়নিতো? এই ভাবনা তার মনে আসার সাথে সাথে প্রায় বিদ্যুৎ গতিতেই ছুটে চললো রাজমণির বাড়ির দিকে।
বৃহস্পতিবার, ২৪ এপ্রিল, ২০১৪
ছায়া
-বালুঝড় দেখেছ কখনো?
-না'তো দেখিনি। তুমি দেখেছো ?
-না, আমিও দেখিনি তবে অনুভব করতে পারছি তোমার হাতের স্পর্শে।
-আমার হাতের স্পর্শে? কি বলছ তুমি এসব? আমার হাত যে তোমার হাতে বন্ধী।
-আমার হাতে তোমার হাত রয়েছে বলেই তো বুঝতে পেরেছি। ধমনীতে রক্ত সঞ্চালনের ধ্বনিই আমাকে জানিয়ে দিয়েছে তোমার বুকে কত উত্তাল ঝড় বইছে।
রবির শেষ কথাটি শুনে খানিকেই থমকে যায় ছায়া, এই মাত্র বুঝি সশব্দে বিস্ফোরিত হলো গোধুলির স্নিগ্ধ আলো বিলানো সূর্যটি। মুহূর্তেই অবরুদ্ধ অশ্রুর ফোয়ারা বইতে শুরু করে।
-আমাকে এখন যেতে দাও, আমি চলে যাবো।
অশ্রু মুছতে মুছতে বলে ছায়া।
-এই তোমাদের একটা সমস্যা, অল্পতেই চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরে, কিন্তু আমাকে দেখো এক ফোটা অশ্রুও ঝরেনি আজ অবধি, যন্ত্রণার তপ্তায় নিজেদের গুছিয়ে বরফ হয়ে তারা ভালই রয়েছে আজও।
-আমি এখন যেতে চাই, খানিক বাদে আঁধার নেমে যাবে, তুমিতো জানই আমি আঁধার নই আলোর সঙ্গী।
-হ্যাঁ, জানি বলেইতো বলছি' এখন তুমি যেতে পারবে না, সূর্যটি এখনো যে মাথার উপরে নীল আকাশকে রক্তাম্বর পরিয়ে দিব্যি হেসে যাচ্ছে। আঁধার নামার পূর্বে তুমি কিভাবে যাবে?
আবার ছায়া চুপসে গিয়ে হাঁটতে থাকে নাক বরাবর ধুলায়িত পথটি ধরে। কথার ফাঁকে কখন যে রবির হাতটি ছেড়ে দিয়েছে সে নিজেই টের পায়নি শুধু তার নিজের দ্রুত উঠানামা করা শ্বাস প্রশ্বাসের ব্যাকুলতা ছাড়া। নিরবেই হেটে চলছে দু'জন, দু'জনের যেন একটিই আকাংখা, সূর্য ডোবার।
-কেমন আছো তুমি?
নিরবতা ভেঙ্গে দিয়ে ছায়া বললো।
-হা হা হা যাক শেষ বেলাতে এসে তাহলে জানতে চাইলেই কেমন আছি আমি! ভেবেছিলাম তুমি জানতে চাইবে না আমি কেমন আছি কারণ তুমিতো জানতেই সেই প্রথম থেকে আমি কেমন থাকবো। মনে আছে শেষ বারের পত্রটিতে তুমি বলেছিলে আমি নাকি অনেক ভালো থাকবো? আমি তোমার সেই বিশ্বাস আজও ভঙ্গ করিনি। আজও আমি তেমনি আছি যেমন তুমি চলে যাবার ঠিক পরমুহুর্তে ছিলাম।
-ভুলে যাওয়াই ভালো, যখন আর ফিরে যাওয়া যাবে না ফেলে আসা মুচড়ে যাওয়া দিনের কাছে। তখন কেনইবা আর মনে রাখা?
এই বলেই ছায়া চলে যেতে উদ্ধত্য হলে রবি তার হাতটি আচমকা শক্ত করে ধরে ফেলে। সাথে সাথে ক্ষুদ্ব হয়ে উঠে রবি। হঠাৎ ক্ষিপ্ত হয়ে যাওয়া রবি বুঝতেই পারেনি কোমল হাতের চুঁড়ি ভাঙ্গার শব্দ।
-তোমাকে না বললাম তুমি সূর্য ডোবার আগে যেতে পারবে না? তুমি কি বুঝতে পারোনি আমার কথা?? চুপ করে থাকো ব্যাস।
ছায়া পারলো না তার হাত থেকে নিজের কোমল হাতটি ছাড়াতে শুধু তাকিয়ে থাকলো ক্রোধে জ্বলজ্বল করা রবির চোখের দিকে।
-আমি চলে যাওয়ার পরও তুমি তোমার রাগকে দমাতে পারোনি? ভেবেছিলাম আমি চলে গেলে হয়তো ক্রোধের ইন্দ্রজাল থকে বেড়িয়ে আসতে পারবে তুমি, কিন্তু তুমি যে ঠিক আগের মতই রয়ে গেলে রবি। তোমার ক্রোধের পলিতে ভরাট নদীতে আমি সাঁতার কাটতে পারবোনা বলেই চলে গিয়েছিলাম।
-তুমি চাইলে কি পারতে না এই আগুনের ফুলকিকে তোমার শীতল বুকে নিয়ে ক্ষান্ত করে দিতে?
-আমি আর পুরোনো কথা মনে করতে চাইনা, আমার জন্য সবাই অপেক্ষা করছে আমাকে এখন যেতে হবে।
নিমিষেই রবি ছেড়ে দেয় ছায়ার কোমল হাতটিকে, সাথে সাথেই ছায়া হাটতে শুরু করে সামনের দিকে রবিকে পিছনে ফেলে। রবি চারদিকে তাকিয়ে দেখে খানিকটা অন্ধকার নেমে এসেছে ধরিনীতে। সূর্যটাও কখন যে অস্তে গেল টেরই পেলো না রবি। আঁধারের হালকা কুয়াশার মাঝে ছায়া মিলিয়ে যায়। সেখানেই স্থির ভাবেই দাড়িয়ে থাকে সে যেখানে ছায়ার হাত ছেড়ে দিয়েছিলো। তার মন বলছে ছায়া আবার ফিরে আসবে, ভাবতে ভাবতে দেখে জোত্স্নার আলোয় আলোকিত চারপাশ। একটি দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে রবিও ফিরে আসে আপন গন্তব্যে ছায়ার হাত ধরে।
-না'তো দেখিনি। তুমি দেখেছো ?
-না, আমিও দেখিনি তবে অনুভব করতে পারছি তোমার হাতের স্পর্শে।
-আমার হাতের স্পর্শে? কি বলছ তুমি এসব? আমার হাত যে তোমার হাতে বন্ধী।
-আমার হাতে তোমার হাত রয়েছে বলেই তো বুঝতে পেরেছি। ধমনীতে রক্ত সঞ্চালনের ধ্বনিই আমাকে জানিয়ে দিয়েছে তোমার বুকে কত উত্তাল ঝড় বইছে।
রবির শেষ কথাটি শুনে খানিকেই থমকে যায় ছায়া, এই মাত্র বুঝি সশব্দে বিস্ফোরিত হলো গোধুলির স্নিগ্ধ আলো বিলানো সূর্যটি। মুহূর্তেই অবরুদ্ধ অশ্রুর ফোয়ারা বইতে শুরু করে।
-আমাকে এখন যেতে দাও, আমি চলে যাবো।
অশ্রু মুছতে মুছতে বলে ছায়া।
-এই তোমাদের একটা সমস্যা, অল্পতেই চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরে, কিন্তু আমাকে দেখো এক ফোটা অশ্রুও ঝরেনি আজ অবধি, যন্ত্রণার তপ্তায় নিজেদের গুছিয়ে বরফ হয়ে তারা ভালই রয়েছে আজও।
-আমি এখন যেতে চাই, খানিক বাদে আঁধার নেমে যাবে, তুমিতো জানই আমি আঁধার নই আলোর সঙ্গী।
-হ্যাঁ, জানি বলেইতো বলছি' এখন তুমি যেতে পারবে না, সূর্যটি এখনো যে মাথার উপরে নীল আকাশকে রক্তাম্বর পরিয়ে দিব্যি হেসে যাচ্ছে। আঁধার নামার পূর্বে তুমি কিভাবে যাবে?
আবার ছায়া চুপসে গিয়ে হাঁটতে থাকে নাক বরাবর ধুলায়িত পথটি ধরে। কথার ফাঁকে কখন যে রবির হাতটি ছেড়ে দিয়েছে সে নিজেই টের পায়নি শুধু তার নিজের দ্রুত উঠানামা করা শ্বাস প্রশ্বাসের ব্যাকুলতা ছাড়া। নিরবেই হেটে চলছে দু'জন, দু'জনের যেন একটিই আকাংখা, সূর্য ডোবার।
-কেমন আছো তুমি?
নিরবতা ভেঙ্গে দিয়ে ছায়া বললো।
-হা হা হা যাক শেষ বেলাতে এসে তাহলে জানতে চাইলেই কেমন আছি আমি! ভেবেছিলাম তুমি জানতে চাইবে না আমি কেমন আছি কারণ তুমিতো জানতেই সেই প্রথম থেকে আমি কেমন থাকবো। মনে আছে শেষ বারের পত্রটিতে তুমি বলেছিলে আমি নাকি অনেক ভালো থাকবো? আমি তোমার সেই বিশ্বাস আজও ভঙ্গ করিনি। আজও আমি তেমনি আছি যেমন তুমি চলে যাবার ঠিক পরমুহুর্তে ছিলাম।
-ভুলে যাওয়াই ভালো, যখন আর ফিরে যাওয়া যাবে না ফেলে আসা মুচড়ে যাওয়া দিনের কাছে। তখন কেনইবা আর মনে রাখা?
এই বলেই ছায়া চলে যেতে উদ্ধত্য হলে রবি তার হাতটি আচমকা শক্ত করে ধরে ফেলে। সাথে সাথে ক্ষুদ্ব হয়ে উঠে রবি। হঠাৎ ক্ষিপ্ত হয়ে যাওয়া রবি বুঝতেই পারেনি কোমল হাতের চুঁড়ি ভাঙ্গার শব্দ।
-তোমাকে না বললাম তুমি সূর্য ডোবার আগে যেতে পারবে না? তুমি কি বুঝতে পারোনি আমার কথা?? চুপ করে থাকো ব্যাস।
ছায়া পারলো না তার হাত থেকে নিজের কোমল হাতটি ছাড়াতে শুধু তাকিয়ে থাকলো ক্রোধে জ্বলজ্বল করা রবির চোখের দিকে।
-আমি চলে যাওয়ার পরও তুমি তোমার রাগকে দমাতে পারোনি? ভেবেছিলাম আমি চলে গেলে হয়তো ক্রোধের ইন্দ্রজাল থকে বেড়িয়ে আসতে পারবে তুমি, কিন্তু তুমি যে ঠিক আগের মতই রয়ে গেলে রবি। তোমার ক্রোধের পলিতে ভরাট নদীতে আমি সাঁতার কাটতে পারবোনা বলেই চলে গিয়েছিলাম।
-তুমি চাইলে কি পারতে না এই আগুনের ফুলকিকে তোমার শীতল বুকে নিয়ে ক্ষান্ত করে দিতে?
-আমি আর পুরোনো কথা মনে করতে চাইনা, আমার জন্য সবাই অপেক্ষা করছে আমাকে এখন যেতে হবে।
নিমিষেই রবি ছেড়ে দেয় ছায়ার কোমল হাতটিকে, সাথে সাথেই ছায়া হাটতে শুরু করে সামনের দিকে রবিকে পিছনে ফেলে। রবি চারদিকে তাকিয়ে দেখে খানিকটা অন্ধকার নেমে এসেছে ধরিনীতে। সূর্যটাও কখন যে অস্তে গেল টেরই পেলো না রবি। আঁধারের হালকা কুয়াশার মাঝে ছায়া মিলিয়ে যায়। সেখানেই স্থির ভাবেই দাড়িয়ে থাকে সে যেখানে ছায়ার হাত ছেড়ে দিয়েছিলো। তার মন বলছে ছায়া আবার ফিরে আসবে, ভাবতে ভাবতে দেখে জোত্স্নার আলোয় আলোকিত চারপাশ। একটি দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে রবিও ফিরে আসে আপন গন্তব্যে ছায়ার হাত ধরে।
রবিবার, ৬ এপ্রিল, ২০১৪
পালঙ্ক
যাক তাহলে অনেক বছর পর হলেও বাড়িটি আজ জাকজমকপূর্ণ হলো। মাছিদের ভোঁ ভোঁ করে শোক প্রকাশ করাটাই শুধু বিরক্তিকর।
পুরনো টিনের চালের ফুটো দিয়ে বৃষ্টি পড়ে বলে পালঙ্কটি সড়িয়ে নেয়া হচ্ছে দালান ঘরের ছাঁদের নিচে। পালঙ্কে পিঠ লাগানোর কথা আমারি ছিলো তাই এক পলক তাকাতে ভুলে যায়নি।
অদম্য কে দমন করে পিঠ লাগিয়ে পবিত্র পালঙ্কটিকে অপবিত্র করার হাত থেকে রক্ষা পেলাম কারণ যার জন্য আজকের এই শয্যা সে আমার অনেক প্রিয় মানুষ ছিলো এখন মনে হয় নেই, না অস্বীকার করে লাভ নেই এখনো সে প্রিয় মানুষ হয়েই রয়েছে এবং থাকবে।
তার কি হয়েছে? সারাজীবন নিজে একা একা গোসল করলো আজ দেখি কয়েকজন মিলেই তাকে গোসল করাচ্ছে!!!
আমার সহ্য হচ্ছে না একদম এসব।
তার জন্য নিরাপদ, যথোপযুক্ত স্থানেই এখন পালঙ্কটি।
সোমবার, ২৪ মার্চ, ২০১৪
কবরস্থান
আশাহত দিনান্তে টং-এর দোকানে
চলমান আধুনিক সঙ্গীতের আকুতিমালায়
বিগলিত চিত্তে এলাকার নতুন ভাড়াটিয়া--
-"না ভাই এইবার আর ভুল করতাম না "
"এইডা তুমি কি কও ? পত্যেকবার তো একই গান হুনি "
জবাব পায় না খুঁজে, আচম্বিত-
"ভাই সাব হুঁনছি গতবছর উনি-ই
বাঁইচ্যা থাহা মানুষের লাইগা এলাকার নতুন কবরস্থানের জমিনডা দিছে ??"
"হ্যাঁ।"
"তইলে আর কথা না কইয়্যা জিকির করো।"
আবার চুমুক লাগে শীতল চা -এর কাপে।
চলমান আধুনিক সঙ্গীতের আকুতিমালায়
বিগলিত চিত্তে এলাকার নতুন ভাড়াটিয়া--
-"না ভাই এইবার আর ভুল করতাম না "
"এইডা তুমি কি কও ? পত্যেকবার তো একই গান হুনি "
জবাব পায় না খুঁজে, আচম্বিত-
"ভাই সাব হুঁনছি গতবছর উনি-ই
বাঁইচ্যা থাহা মানুষের লাইগা এলাকার নতুন কবরস্থানের জমিনডা দিছে ??"
"হ্যাঁ।"
"তইলে আর কথা না কইয়্যা জিকির করো।"
আবার চুমুক লাগে শীতল চা -এর কাপে।
বৃহস্পতিবার, ২০ মার্চ, ২০১৪
কুঞ্জকানন
আমি চির তরে দূরে চলে যাবো
তবু আমারে দিবোনা ভুলিতে,
আমি বাতাস হইয়া, জড়াইবো কেশ
বেনী যাবে যবে খুলিতে।
তোমার সুরের নেশায় যখন
ঝিমাবে আকাশ, কাদিঁবে পবন,
রোদন হইয়া আসিব তখন
তোমারো বক্ষে দুলিতে।
আসিবে তোমার পরম উৎসব
কত প্রিয়জন, কে জানে
মনে পড়ে যাবে কোন সেই ভিখারী
পাইনি ভিক্ষা এখানে।
তোমার কুঞ্জ পথে যেতে হায়
চমকে থামিয়া যাবে বেদনায়
দেখিব কে যেন মরে পড়ে আছে
তোমার পথের ধূলিতে।।
সন্ধ্যার মন্থর গতিতে বহমান বাতাসে সাথে উড়ছে বিন্ধ্যার কালো কেশ। বাতাস যেন তার কেশে খেলা করছে নিবিড় সন্তর্পণে। আর কাজী নজরুলের কবিতা দোলা দিচ্ছে মনের গহীনে। বাতাস আর কাব্যের বন্ধুত্ব পুরনো হলেও বিন্ধ্যার কাছে এই বন্ধুত্বকে আজ নিতান্তই ক্লেশ নিপীড়নের সহযোদ্ধা মনে হল। ভাবনার অতল মহাসাগরে ডুবে বিন্ধ্যা, ছুটে যেতে চায় মন খড়-কুটো দিয়ে তৈরি আবাসে আবার ক্ষনিকেই শ্যাওলা পরা দেয়ালে বন্দী হয়ে যায় মন।
মায়ের ডাকে হঠাৎ সম্বিৎ ফিরে এলো। মা কখন যে পিছনে আসে দাড়িয়েছে তা বিন্ধ্যা বলতেই পারবে না। মায়ের দিকে তাকিয়ে একটি দীর্ঘনিশ্বাস ফেলল, নিশ্বাসে ছিল মাতাল ভাবনার গাঢ় স্বাদ।
-মা কখন এসেছ ?
-এইতো কিছুক্ষণ
-কিছু বলবে ?
-হ্যাঁ, তুই তৈরী হয়ে নে। মেহমানরা সবাই চলে এসেছে। তাড়াতাড়ি আয় তুই। আর হ্যাঁ সমুদ্র ফোন করেছিল। তোর সাথে নাকি কথা আছে।
-আচ্ছা ঠিক আছে তুমি যাও আমি আসছি।
এই অল্প কথাতে মাকে বিদায় দিয়ে সাথে সাথে উঠে আসে জানালার পাশ থেকে। দু'হাতে বন্ধ করা জানালাটির ওপাশে পরে থাকে স্মৃতিপথ যা শুধু আজ ধুলায়িত ঊষর মরুভূমি।
বিন্ধ্যার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে সমুদ্রের সাথে।আজ গায়ে হলুদ কাল বিয়ে। সারাটি বাড়ি জুড়ে মাছের বাজার বসেছে। আত্মীয় স্বজন সবাই যেন পুরো বাড়িটিকে আসলেই মাছের বাজারে পরিনত করেছে। অসহ্য লাগছে বিন্ধ্যার এই সব আলোকসজ্জা আর হৈ চৈ। অনিচ্ছাকৃতভাবে হলেও পরিবারের সবার চাপে পরে গায়ে হলুদের সব অনুষ্ঠান শেষ করে ক্লান্ত দেহে লুটিয়ে পরেছে বিছানায়। আজ রাত্রিটি হবে শেষ একাকিত্বের রাত্রি তার জীবনে। কাল থেকে পাশে শায়িত থাকবে সমুদ্র। এই ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পরেছে সে নিজেই জানে না। চলে যায় ঘুমের রাজ্যে, ফেলে যায় পৃথিবীর করুন বাস্তবতা।
মাঝ রাতে আচম্বিত মৃদু শব্দে কারো নড়াচড়া অনুভত হয় অন্ধকার ঘরটিতে। নাম ধরে ডাকা অস্পষ্ট শব্দ বিন্ধ্যার কানে আসে। শব্দটা অস্পষ্ট হলেও চিনে নেয় বিন্ধ্যা, চেনা স্বর যা কখনো ভুলা যায় না। অরণ্য বিন্ধ্যার পাশে এসে বসে আলতো করে কপলা হাত রাখে।
-তুমি আজ ঘুমাচ্ছ কেন বিন্ধ্যা ?আজতো ঘুমানোর কথা ছিল না তোমার, তোমার মেহেদী রাতে চুপি চুপি কুঞ্জকাননে দেখা করার কথা ছিল। কথা ছিল সঙ্গোপনে রাতে চাঁদের জোত্স্নাতে অঙ্কিত করবো কলঙ্ক। তোমার মেহেদির রঙে সমুদ্র হবে লোহিত বর্ণ। অনেক কথাই তো ছিল কিন্তু আজ তোমার মেহেদী রাত তুমি ঘুমিয়ে আছ কেন ? চল যাই দেখো দূরে হিন্দোলের সুরে আজ নাচব আমরা। কালতো তোমার বিয়ে আর হয়ত যাওয়া হবে না কুঞ্জকাননে। চল শেষবারের মত।
-না অরণ্য, তুমিও কথা দিয়ে কথা রাখোনি আমার সাথে। সেদিন আমাকে বলেছিলে তুমি আসবে কিন্তু আসনি। আমি অপেক্ষায় ছিলাম তোমার, চেয়েছিলাম তোমার আসার সেই চির সচেনা পথে যেই পথে যেখানে আমি আর তুমি হেটেছি ক্লান্তিহীন হয়ে অবিরাম। তুমি আমাকে সান্তনার বাণী শুনিয়েছিলে সেদিন বলেছিলে তুমি আসবেই। তোমার অপেক্ষা করতে করতে আমি ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলাম। তুমি আসনি দেখে অভিমান করেছিলাম তোমার উপর। সেই অভিমানে আর অপেক্ষা না করেই আমি চলে আসি। অনেক ক্লান্ত লেগেছিল আমার সেদিন একা পথ চলতে তুমি পাশে ছিলে না বলে নীরব পথটির ধারে জেগে থাকা শত বৃক্ষের শাখাগুলোও আমার দিকে ছুটে আসছিল। কুঁয়াশার সাথে শশ্মানের জলন্ত আগুনের ধোঁয়া মিশে যায় আর আমি সেই ধোঁয়াশায় পথ চলতে চলতে ফিরে এসেছিলাম। আজ আর আমার কুঞ্জকাননে যাওয়া হবে তোমার সাথে। কথা দিয়েছিলাম মেহেদির লাল রঙে সমুদ্র লাল টুকটুকে করে দিব কিন্তু চেয়ে দেখো আমার মেহেদির রং আজ ধূসর রঙের। আজ আর যাব না তুমি ফিরে যাও। কাল সমুদ্রের সাথে আমার বিয়ে। এখন আমি আর তোমার কোনো কলঙ্কের বোঝা বইতে পারব না। তুমি ফিরে যাও। আমি যাব না কুঞ্জকাননে।
-তুমি কি পারবে আমাকে ভুলে যেতে।তোমার জানালার পাশে দাড়িয়ে দেখেছি সন্ধ্যায় তুমি কাজী নজরুলের আমি চিরতরে দূরে চলে যাব কবিতাটি পরেছিলে, আমি তো সেই কবিতার মত বারে বারে ফিরে আসবো তোমার কাছে বিভিন্ন ছদ্মবেশে।
অরন্যের কথা শুনে মুহুর্তেই বিন্ধ্যা শান্ত হয়ে যায়। ভুলে যায় শত অভিমান।
-তুমি কেন সেদিন আমাকে কথা দিয়ে কথা রাখলে না বল অরণ্য? কেন তুমি তোমার হৃদয় ক্যানভাসে অঙ্কিত করলে আমায় শুভ্র শাড়িতে ?কেন কথা দিয়ে কথা রাখলে না। তুমি তো জানতে তোমাকে ছাড়া আমার এই পৃথিবীতে কোনো স্বাদ নেই। তুমি যখন এসেছই আজ আমাকে একেবারে নিয়ে চল তোমার সাথে।
-না বিন্ধ্যা, আজ আর তা হয় না, আজ তোমার বিয়ে আর তাছাড়া আমি চাইলেই তোমাকে আমার সাথে নিয়ে যেতে পারি না অথবা তুমি চাইলেই আমার সাথে যেতে পর না আজ। কারো ইচ্ছাতেই আজ যাওয়া হবে না। আমি তোমার পাশে তো সব সময়ই থাকব তুমি একা নও। আমার ঘড়ির কাটা আজ থেমে গেলেও আমি তোমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাব নিরন্তর। অভিমান করো না আর আমার সাথে তুমি কোনদিন। আমি তোমার নিশ্বাসের শব্দ হয়ে তোমার পাশে রব চিরকাল।
-আজ আমি তোমার সাথে যাবই। আমাকে সাথে করে নিতেই হবে তোমার।
-আজও কি তুমি সেই একরোখা রয়ে গেলে ?
-আমি যে পরিবর্তন হতে জানি না আকাশের মত রং বদলাতে পারি না।
-তুমি সত্যি যাবে আমার সাথে?
-আমি মিথ্যে বলিনি কখনো, আমি মিথ্যে বলি না, নিয়ে চল আমায়, আমি আজ তোমার আচড়ে কলঙ্কিত হতে চাই।
অরণ্য ও বিন্ধ্যা দুজন দুজনার হাত ধরে হেটে চলছে প্রিয় কুঞ্জকাননে। ধীরে ধীরে দু'জনে মিশে যাচ্ছে অন্ধকারের আবছাতে।
সমুদ্রের ছোট বেলা থেকেই ইচ্ছা তার বউকে পালকিতে করে আনবে। তার ভাবনা অনুযায়ী সে পালকি নিয়েই এসেছে আজ বিন্ধ্যার বাড়িতে,বিন্ধ্যাকে বউ করে নিয়ে যাবে।
তবু আমারে দিবোনা ভুলিতে,
আমি বাতাস হইয়া, জড়াইবো কেশ
বেনী যাবে যবে খুলিতে।
তোমার সুরের নেশায় যখন
ঝিমাবে আকাশ, কাদিঁবে পবন,
রোদন হইয়া আসিব তখন
তোমারো বক্ষে দুলিতে।
আসিবে তোমার পরম উৎসব
কত প্রিয়জন, কে জানে
মনে পড়ে যাবে কোন সেই ভিখারী
পাইনি ভিক্ষা এখানে।
তোমার কুঞ্জ পথে যেতে হায়
চমকে থামিয়া যাবে বেদনায়
দেখিব কে যেন মরে পড়ে আছে
তোমার পথের ধূলিতে।।
সন্ধ্যার মন্থর গতিতে বহমান বাতাসে সাথে উড়ছে বিন্ধ্যার কালো কেশ। বাতাস যেন তার কেশে খেলা করছে নিবিড় সন্তর্পণে। আর কাজী নজরুলের কবিতা দোলা দিচ্ছে মনের গহীনে। বাতাস আর কাব্যের বন্ধুত্ব পুরনো হলেও বিন্ধ্যার কাছে এই বন্ধুত্বকে আজ নিতান্তই ক্লেশ নিপীড়নের সহযোদ্ধা মনে হল। ভাবনার অতল মহাসাগরে ডুবে বিন্ধ্যা, ছুটে যেতে চায় মন খড়-কুটো দিয়ে তৈরি আবাসে আবার ক্ষনিকেই শ্যাওলা পরা দেয়ালে বন্দী হয়ে যায় মন।
মায়ের ডাকে হঠাৎ সম্বিৎ ফিরে এলো। মা কখন যে পিছনে আসে দাড়িয়েছে তা বিন্ধ্যা বলতেই পারবে না। মায়ের দিকে তাকিয়ে একটি দীর্ঘনিশ্বাস ফেলল, নিশ্বাসে ছিল মাতাল ভাবনার গাঢ় স্বাদ।
-মা কখন এসেছ ?
-এইতো কিছুক্ষণ
-কিছু বলবে ?
-হ্যাঁ, তুই তৈরী হয়ে নে। মেহমানরা সবাই চলে এসেছে। তাড়াতাড়ি আয় তুই। আর হ্যাঁ সমুদ্র ফোন করেছিল। তোর সাথে নাকি কথা আছে।
-আচ্ছা ঠিক আছে তুমি যাও আমি আসছি।
এই অল্প কথাতে মাকে বিদায় দিয়ে সাথে সাথে উঠে আসে জানালার পাশ থেকে। দু'হাতে বন্ধ করা জানালাটির ওপাশে পরে থাকে স্মৃতিপথ যা শুধু আজ ধুলায়িত ঊষর মরুভূমি।
বিন্ধ্যার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে সমুদ্রের সাথে।আজ গায়ে হলুদ কাল বিয়ে। সারাটি বাড়ি জুড়ে মাছের বাজার বসেছে। আত্মীয় স্বজন সবাই যেন পুরো বাড়িটিকে আসলেই মাছের বাজারে পরিনত করেছে। অসহ্য লাগছে বিন্ধ্যার এই সব আলোকসজ্জা আর হৈ চৈ। অনিচ্ছাকৃতভাবে হলেও পরিবারের সবার চাপে পরে গায়ে হলুদের সব অনুষ্ঠান শেষ করে ক্লান্ত দেহে লুটিয়ে পরেছে বিছানায়। আজ রাত্রিটি হবে শেষ একাকিত্বের রাত্রি তার জীবনে। কাল থেকে পাশে শায়িত থাকবে সমুদ্র। এই ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পরেছে সে নিজেই জানে না। চলে যায় ঘুমের রাজ্যে, ফেলে যায় পৃথিবীর করুন বাস্তবতা।
মাঝ রাতে আচম্বিত মৃদু শব্দে কারো নড়াচড়া অনুভত হয় অন্ধকার ঘরটিতে। নাম ধরে ডাকা অস্পষ্ট শব্দ বিন্ধ্যার কানে আসে। শব্দটা অস্পষ্ট হলেও চিনে নেয় বিন্ধ্যা, চেনা স্বর যা কখনো ভুলা যায় না। অরণ্য বিন্ধ্যার পাশে এসে বসে আলতো করে কপলা হাত রাখে।
-তুমি আজ ঘুমাচ্ছ কেন বিন্ধ্যা ?আজতো ঘুমানোর কথা ছিল না তোমার, তোমার মেহেদী রাতে চুপি চুপি কুঞ্জকাননে দেখা করার কথা ছিল। কথা ছিল সঙ্গোপনে রাতে চাঁদের জোত্স্নাতে অঙ্কিত করবো কলঙ্ক। তোমার মেহেদির রঙে সমুদ্র হবে লোহিত বর্ণ। অনেক কথাই তো ছিল কিন্তু আজ তোমার মেহেদী রাত তুমি ঘুমিয়ে আছ কেন ? চল যাই দেখো দূরে হিন্দোলের সুরে আজ নাচব আমরা। কালতো তোমার বিয়ে আর হয়ত যাওয়া হবে না কুঞ্জকাননে। চল শেষবারের মত।
-না অরণ্য, তুমিও কথা দিয়ে কথা রাখোনি আমার সাথে। সেদিন আমাকে বলেছিলে তুমি আসবে কিন্তু আসনি। আমি অপেক্ষায় ছিলাম তোমার, চেয়েছিলাম তোমার আসার সেই চির সচেনা পথে যেই পথে যেখানে আমি আর তুমি হেটেছি ক্লান্তিহীন হয়ে অবিরাম। তুমি আমাকে সান্তনার বাণী শুনিয়েছিলে সেদিন বলেছিলে তুমি আসবেই। তোমার অপেক্ষা করতে করতে আমি ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলাম। তুমি আসনি দেখে অভিমান করেছিলাম তোমার উপর। সেই অভিমানে আর অপেক্ষা না করেই আমি চলে আসি। অনেক ক্লান্ত লেগেছিল আমার সেদিন একা পথ চলতে তুমি পাশে ছিলে না বলে নীরব পথটির ধারে জেগে থাকা শত বৃক্ষের শাখাগুলোও আমার দিকে ছুটে আসছিল। কুঁয়াশার সাথে শশ্মানের জলন্ত আগুনের ধোঁয়া মিশে যায় আর আমি সেই ধোঁয়াশায় পথ চলতে চলতে ফিরে এসেছিলাম। আজ আর আমার কুঞ্জকাননে যাওয়া হবে তোমার সাথে। কথা দিয়েছিলাম মেহেদির লাল রঙে সমুদ্র লাল টুকটুকে করে দিব কিন্তু চেয়ে দেখো আমার মেহেদির রং আজ ধূসর রঙের। আজ আর যাব না তুমি ফিরে যাও। কাল সমুদ্রের সাথে আমার বিয়ে। এখন আমি আর তোমার কোনো কলঙ্কের বোঝা বইতে পারব না। তুমি ফিরে যাও। আমি যাব না কুঞ্জকাননে।
-তুমি কি পারবে আমাকে ভুলে যেতে।তোমার জানালার পাশে দাড়িয়ে দেখেছি সন্ধ্যায় তুমি কাজী নজরুলের আমি চিরতরে দূরে চলে যাব কবিতাটি পরেছিলে, আমি তো সেই কবিতার মত বারে বারে ফিরে আসবো তোমার কাছে বিভিন্ন ছদ্মবেশে।
অরন্যের কথা শুনে মুহুর্তেই বিন্ধ্যা শান্ত হয়ে যায়। ভুলে যায় শত অভিমান।
-তুমি কেন সেদিন আমাকে কথা দিয়ে কথা রাখলে না বল অরণ্য? কেন তুমি তোমার হৃদয় ক্যানভাসে অঙ্কিত করলে আমায় শুভ্র শাড়িতে ?কেন কথা দিয়ে কথা রাখলে না। তুমি তো জানতে তোমাকে ছাড়া আমার এই পৃথিবীতে কোনো স্বাদ নেই। তুমি যখন এসেছই আজ আমাকে একেবারে নিয়ে চল তোমার সাথে।
-না বিন্ধ্যা, আজ আর তা হয় না, আজ তোমার বিয়ে আর তাছাড়া আমি চাইলেই তোমাকে আমার সাথে নিয়ে যেতে পারি না অথবা তুমি চাইলেই আমার সাথে যেতে পর না আজ। কারো ইচ্ছাতেই আজ যাওয়া হবে না। আমি তোমার পাশে তো সব সময়ই থাকব তুমি একা নও। আমার ঘড়ির কাটা আজ থেমে গেলেও আমি তোমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাব নিরন্তর। অভিমান করো না আর আমার সাথে তুমি কোনদিন। আমি তোমার নিশ্বাসের শব্দ হয়ে তোমার পাশে রব চিরকাল।
-আজ আমি তোমার সাথে যাবই। আমাকে সাথে করে নিতেই হবে তোমার।
-আজও কি তুমি সেই একরোখা রয়ে গেলে ?
-আমি যে পরিবর্তন হতে জানি না আকাশের মত রং বদলাতে পারি না।
-তুমি সত্যি যাবে আমার সাথে?
-আমি মিথ্যে বলিনি কখনো, আমি মিথ্যে বলি না, নিয়ে চল আমায়, আমি আজ তোমার আচড়ে কলঙ্কিত হতে চাই।
অরণ্য ও বিন্ধ্যা দুজন দুজনার হাত ধরে হেটে চলছে প্রিয় কুঞ্জকাননে। ধীরে ধীরে দু'জনে মিশে যাচ্ছে অন্ধকারের আবছাতে।
সমুদ্রের ছোট বেলা থেকেই ইচ্ছা তার বউকে পালকিতে করে আনবে। তার ভাবনা অনুযায়ী সে পালকি নিয়েই এসেছে আজ বিন্ধ্যার বাড়িতে,বিন্ধ্যাকে বউ করে নিয়ে যাবে।
রবিবার, ২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪
ভালবাসা ও নারী
ছোট একটা গল্প বলি--------


একটি উচ্চবিত্ত ঘরের ছেলে ভালবাসত একটি মধ্যবিত্তের ঘরের মেয়েকে।ছেলেটি তাকে অনেক অনেক ভালবাসত।আজ শুক্রবার ছেলেটিকে নিয়ে মেয়েটির বেড়াতে যাওয়ার কথা। সকাল বেলা ছেলেটি মেয়েটিকে কল করলে সে মেয়েটি তাকে বলল সে খুব অসুস্থ। যার কারণে সকাল থেকে সে কিছুই খায়নি। মেয়েটি আজ বিকালে সে বেরও হতে পারবেনা। মেয়েটি অসুস্থতার কারণে ভালোভাবে কথা বলতে না পারায় ছেলেটি ফোন রেখে দিল। সেদিন ছেলেটি তার পরিবারের সাথে দুপুরে খাবার খেতে বসলো , খাবার টেবিলে হরেক রকম খাবার সাজানো। হঠাৎ তার মনে হলো তার ভালবাসার মানুষটি সকালে তাকে বলেছিল সে অসুস্থ আর অসুস্থতার কারণে সে সকালের নাস্তাও করেনি। এমন সময় ছেলেটি তাকে আবার কল করে তার অসুস্থতার খবর নিল এরপর ছেলেটি আবার খাবার টেবিলে এসে খেতে বসলো। ছেলেটি মুখে তখন মনে পড়ল তার ভালবাসার মানুষটি দুপুরের খাবার খায়নি। ছেলেটির পেতে আর খাবার গেলো না। নানা বাহানায় সে উঠেগেলো খাবার টেবিল থেকে।
বিকাল হল। ছেলেটি খারাপ করে বসে রইলো। শুধু মেয়েটিকে অনুভব করতে থাকল। সকাল থেকে মেয়েটি একবার তার সাথে ভালোভাবে কথা বলে নাই। ছেলেটির খুব ইচ্ছা হলো তার একটু খবর নেওয়ার কিন্তু মেয়েটিকে যখন কল করলো তখন মেয়েটি খুব ফিস ফিস করে বলল তার মাথায় পানি দিবে তাই এখন সে কথা বলতে পারবে না। ছেলেটি ফোন রেখে দিলেও শান্তি পাচ্ছিল না কোনভাবেই। কোনো কিছুই তার ভালো লাগছিল না। ভাবলো মেয়েটির বাসার সামনে থেকে একটু ঘুরে আসবে কিনা ?মানুষ সান্তনা পাবার জন্য কত কিছুই না খুঁজে। যেই ভাবা সেই কাজ ছেলেটি রওয়ানা দিল মেয়েটির বাসার দিকে। যাওয়ার পথে হঠাৎ অপর দিক থেকে আসা একটি সিএনজি তে একপলকে যেন খুব পরিচিত একটা মুখ নজরে আসলো। না সে ভুল করেনি এটা তারই মুখ যাকে সে অনেক ভালবাসে।
খুব ভীত হয়ে ছেলেটি সেই সিএনজির পিছনে ছুটল। তার মনে খুব আতঙ্ক যে তার কি হলো ? কেন সে সিএনজিতে? হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে নাতো তাকে আবার ? হাজার ভাবনা খেলা করছে তার মাথা। একসময় সিএনজি থামল একটি পার্কের গেট সামনে এবং বেরিয়ে এলো মেয়েটি হা তার ভালবাসার মানুষটিই। সাথে আর একটি সুদর্শন ছেলে। দেখে যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ল তার মাথায়। বুকে তার ব্যাথা হচ্ছিল প্রচন্ড। নীল রঙের কাপড়ে তাকে খুব সুন্দর লাগছিল যদিও মেয়েটির সূন্দুর্য আজ তার জন্য না।
এর চেয়ে বড় কোনো কষ্ট আর কি পারে ছেলেটির জানাছিল না যখন ছেলেটি দেখল তারই ভালবাসার মানুষ হাত ধরে রয়েছে অন্য আর একজনের। সে সব লক্ষ্য করতে থাকলো। এরইমাঝে ছেলেটি কয়েকবার কল দিল সেই মেয়েটির মোবাইলে মেয়েটি একবারও রিসিভ করল না। ছেলেটি কিছুটা দূর থেকে সব দাড়িয়ে দেখছিল।
বিকাল সন্ধ্যা। সন্ধ্যার অন্ধকার যেন বয়ে আনলো ছেলেটির জীবনের পরম দৃশ্য যেটা ভালবাসার মানুষ হিসেবে সহ্য করার ক্ষমতা কতজনের আছে জানি না। ছেলেটি আর থাকতে পারল না সেখানে যখন দেখল তারই ভালবাসার মানুষ সপে দিল নিজেকে সেই ছেলেটির কাছে আর এখন সন্ধ্যার অন্ধকার আলোতে ছেলেটির হাত খেলা করছে সেই মেয়েটির সম্পূর্ণ শরীরে।
রাত তখন ১২ টা। ছেলেটি ফুপিয়ে ফুপিয়ে সেই সন্ধ্যা ৮ টা থেকে কাদছে। ঠিক এমন সময় কল আসল মেয়েটার। রিসিভ করতে ইচ্ছা না করলেও কি বলে সেটা শুনার জন্য তার কলটা ধরল ছেলেটি।
ছেলে- হা বল।
মেয়ে - কি হলো তোমার ?
ছেলে - কোথায় কি হলো?
মেয়ে - সন্ধ্যা থেকে একবার আমার খবর নিলানা তুমি ?তুমি কি যেন না আমি অসুস্থ?তুমি বিকালে কল দিয়েছিলে কিন্তু তখন আম্মু আমার মাথায় পানি দিচ্ছিল তাই রিসিভ না করে কেটে দিয়ে ছিলাম কিন্তু এরপরে তুমি আর আমাকে একবার কাল দাওনি। ছেলেরা এমনি হয় স্বার্থপর। এই বলে মেয়েটাই রাগ করে ফোন কেটে দেয়। এরপর মেয়েটি আর কোনদিন তাকে কল দেয়নি ছেলেটার অপরাধ ছিল এটাই যে সে তাকে আর সন্ধ্যার পর কল দেয়নি আর এটাই ছিল মেয়েটির। বাহানা
এই ছিল আমার গল্প আসলে এটা একটা সত্যি কাহিনী।
উপরের গল্পটার মত হাজারো গল্প আমি খুঁজে পাবেন তার মাঝে হয়ত এমন কিছু গল্প থাকবে যেগুলো পরে আমার এই গল্পটা তুচ্ছ মনে হবে।
সোমবার, ২৭ জানুয়ারি, ২০১৪
ঘুমের ঘোরে পথ চলা
আর কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে বুঝতেছিনা। সেই যে ট্রেন আসি আসি করে ৬ টা ঘন্টা পার করে দিলাম তারপরও ট্রেন আসছে না। কিন্তু আমাকে যে কাল সূর্য ওঠার আগে আদিত্য বৃক্ষটির কাছে পৌছাতে হবে। পৃথিবীতে সে ই একটি মাত্র বৃক্ষ, আর সে তার জীবনের একটিবারই ফল দেয়। সেই ফলটি ফলবে কাল সকাল ভোরে এবং সূর্য উঠার সাথে সাথে আবার বিলীন হয়ে যাবে, আর সেই ফল ভক্ষণের মাঝেই রয়েছে আমার বেচে থাকার আসা, আমার রোগমুক্তি।
কিন্তু ট্রেন এর তো কোনো দেখা পেলাম না এখন পর্যন্ত। তাহলে কি আমার আর যাওয়া হবে না ? তাহলে কি আমাকে আমার এই জীর্ণতা নিয়ে সারাজীবন কাটাতে হবে ? দেখতে দেখতে আমার মত সকল মানুষ জড়ো হয়েছে সেই বৃক্ষের ফল ভক্ষণের আসায়। সবার শুধু একটায় লক্ষ্য আজ সেই বৃক্ষের কাছে পৌছানো।
দুপুর প্রেইয়ে বিকাল আর বিকাল পেরিয়ে সন্ধ্যা হয়ে গেলো। সবার দৃষ্টি যেন ট্রেনের ল্যাম্প পোষ্টের দিকে কখন তা জ্বলে উঠবে। সবাইকে অবাক করে দিয়ে সেই কাঙ্খিত লালবাতি জ্বলে উঠলো। জ্বলে উঠার সাথে সাথেই সবাই হৈ হৈ করে উঠলো। ট্রেনের সাইরেন শুনা যাচ্ছে। ট্রেন গোচরে আসার সাথে সাথেই বাধলো যত বিপত্তি , এতক্ষণ ধরে ট্রেনের অপেক্ষায় থাকা আমার মত শত শত যাত্রিগুলো হঠাৎ যেন উন্মাদ হয়ে গেল। তাদের আর কারদিকেই খেয়াল নেই শুদু তাদের মস্তিস্কে একটাই ভাবনা ট্রেন ধরার আর সেটা যেকোনো কিছুর বিনিময়েই হোক।
যেই না যাত্রীবোঝাই টট্রেনটা এসে প্লাটফর্মে থামলো সাথে সাথে সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ল ট্রেনের প্রবেশদ্বারে। যে যেভাবে পারছে দখল করে নিচ্ছে তাদের জায়গা কিন্ত আমি ? তাদের এই ভীড়ে আমি যেন কোন ঠাই পাচ্ছি না। সবাই শুধু আমাকে ঠেলে সামনে চলে যায়, যদিও প্রথম থেকে আমার অবস্থান ছিল সবার প্রথমে , আর সেই আমি আজ সবাই শেষে। বলার উপেক্ষা রাখেনা সব যাত্রীর মাঝে শুধু আমিই ছিলাম পাতলা এবং সম্পূর্ণ রোগা। আর তার কারণেই আমারই শুদু ঠাই হলো না ট্রেনে।
ট্রেন চলে যাচ্ছে আর আমি শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছি।বাকি সবাই ঠেলাঠেলি করে ট্রেন ধরতে পারলেও রয়েগেলাম আমি। এখন আর আমার পাসে কেউ নেই রাত তখন ১১টা। হাটছি তো হাটছি সেই রেললাইনের পথ ধরে ঘুটঘুটে এই শর্বরীতে যেখানে সুধাকরের প্রভাও অনুপস্থিত। হঠাৎ কারো ডাক শুনে পিছনে ফিরে তাকাই। দেখলাম একটি মেয়ে আমাকে ডাকছে হাতের ইশারায়। আমি প্রথমে একটু অবাক হলাম এই বিদঘুটে রাতে একটি দেখে। ভয়ে ভয়ে তার কাছে গিয়ে জিজ্ঘেশ করলাম সে কে ? সে জবাব দিল '" যেই পথে তুমি হেটে যাচ্ছ সেটা আমারি পথ" অপরূপ সুন্দর সে তাই শুধু চেয়ে থাকলাম অপলক ভাবে। আমার নিরবতা ভেঙ্গে দিয়ে আমার কাছে সে জানতে চাইল আমি কেন এত রাতে এই পথ ধরে হাটছি। যেহেত তারই অধীনস্ত পথ ধরে হাটছিলাম তখন তাকে বললাম আমার সেই ট্রেনে স্থান না হওয়ার কথা। শুনে সে শুধু হাসলো আর বলল সবাই ধরল ট্রেন শুধু তুমি পারলে না ? তখন আমি বললাম আমিতো আর তাদের মত না। আমিতো আর তাদের মত করে শক্তিশালী হয়ে জন্ম নেয়নি তাই আমি পারিনী।
সে একটু চুপ করে থেকে বলল আচ্ছা যাও তুমি যেই পথে যাচ্ছিলে দেখো চেস্টা করে কোনো উত্স খোজে পাওকিনা। তার চঞ্চলাময়ী হাসিতে তার প্রতি একধরনের দুর্বলতা জন্ম নিল আমার। আমাকে যাওয়ার কথা বললে আমি তাকে বললাম আমি বাচতে চাই এই সুন্দর পৃথিবীতে। আমাকে কোনো উপায় বলে দাও কিভাবে আমি সেখানে পৌছাতে পারি। কিন্ত সে চলে যেতে চাইল। আমি আমার আকুল মিনতি দিয়ে তার পথরোধ করলাম। একসময় সে বাধ্য হয়েই বলল চল তাহলে সামনের দিকে এগিয়ে যাই। সে বলল সামনে একটা নদী আছে চল সেখানে গিয়ে দেখি কোনো নৌকা পাওয়া যায় কিনা। নদীপথে গেলেও তুমি তুমার লক্ষে পৌছাতে পারবে। তার কথামত দুজনেই হেটে চললাম সেই নদীর তীরের দিকে।
কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পরে দুজনকে অবাক করে দিয়ে সেই নদী দিয়েই বয়ে যাচ্ছিল একটি ইঞ্জিন বাহিত নৌকা। খুব জোরে শব্দ আসছিল ইঞ্জিনের যেটা আমাদের কানেও পৌছালো। আমার পাসে দাড়িয়ে থাকা সেই অপরূপ মেয়েটি আমাকে বলল জোরে ডাক সেই মাঝিকে সেই হবে করতে পারবে তোমাকে পার। আমিও ডাকা শুরু করলাম মরিয়া হয়ে হয়ে যেন এই আমার শেষ আসা। ইঞ্জিনের জোরালো শব্দে আমার ডাক যেন মাঝির কানেই যাচ্ছে না , মরিয়া হয়ে দিকেই চলেছি কিন্তু মাঝির কোনো গাত্রদাহ হলো না। একসময় মেয়েটি আমাকে বলল স্পষ্ট করে ডাক তুমি মাঝিকে। তোমার শব্দগুলোতো স্পষ্ট না। একে ইঞ্জিনের শব্দ এর উপর তুমি যদি অস্পষ্ট করে ডাক তাহলে তো মাঝি শুনবে না। আমিও আপ্রাণ চেস্টা করে দিকেই চলছি আর, মাঝিও বেয়ে চলছে তার তরী আপন গতিপথে। এভবে দেখতে দেখতে বিলীন হয়ে গেল শেষ আশার তরীটি। অপুরুপা আমার দিকে রক্তচক্ষু নিয়ে তাকিয়ে আছে। আমাকে বলল তুমি যেভাবে ডাকলে মাঝিত দুরে থাক আমিই তো তোমার কথা স্পষ্টভাবে শুনতে পায়নি। অন্যকোনো পুরুষ মানুষ হলে এই নৌকাটি আর এভাবে চলে যেতে পারত না। তখন আমি তাকে বললাম দেখো আমি তাদের মত নই। আমি তাদের মত স্পষ্টভাবে কথা বলতে পারি না। জন্ম থেকেই আমার টাই-টাং এর সমস্যা যার কারণে আমি স্পষ্ট ভাবে কথা বলতে পারি না।
দুজনেই সেই নদীর পথ ধরে হাটতে থাকলাম। হাটতে হাটতে একসময় বোঝতে পারলাম না আমার হয়ত সেই আদিত্য বৃক্ষের কাছে পৌছানো সম্ভব না। সেখানে পৌছানোর জন্য যা দরকার তার কোনো কিছুই আমার কাছে নেই। আমার কাছেতো কিছুই নেই, আমি কোন যোগ্যতায় সেখানে পৌছার আশা করি? নিজেকে আবিষ্কার করলাম একজন অযোগ্য পুরুষ হিসেবে। সাথের সেই অপরুপা সঙ্গীটিকে বললাম আমি আর সেখানে পৌছাতে চাই না। আমি আমার জীবনের স্বাদ পেয়েগেছি তোমার সাথে এই পথচলে। আমার জীবনে যদি কিছু সুখের মুহূর্ত থেকে থাকে সেটা হলো আজকে তোমার সাথে এই পথচলা। তোমার পাশে পথচলার এত সুখ সেটা হয়ত আমি বঝ্তাম না যদি জীবন বাচানোর রাস্তায় প্রথম ট্রেনটা আমি মিস না করতাম। তুমি ফিরে যেন তোমার আপন ঘরে হে অপরুপা , আমি আমার বাকি জীবনটা কোনো ভাবে কাটিয়ে দিব। অসুস্থ এই শরীরের রোগগুলো থেকে সারা পেতে তো আদিত্যে বৃক্ষের কাছে যাওয়াই হলো না। আর বেছে থাকার কোনো আশাই অবশিষ্ট রইলোনা আমার জীবনে।
অপরুপা অনেকক্ষণ আমার চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল 'আমরা দুজন পথ চলতে চলতে অনেক দূর হেটে চলে আসছি যা আমরা নিজেরাও জানি না। অনেকটা পথ পিছনে ফেলে আসছি এখান থেকে আর ফিরে যাওয়ার সম্ভব না। আমাকে সে বলল আমি তোমার পাসে আছি এবং সারাজীবন থাকব যতদিন বেছে থাকি এই নশ্বর পৃথিবীতে। আমি যখন তুমার হাত ধরে এতুটুকু পথ হেটে আসছি আমি আমার জীবনের বাকি পথটুকু তোমার সাথেই হেটে যেতে চাই। সেই অপরুপা মেয়েটি আমাকে উত্সাহ দিতে থাকলো আর জানালো আমরা হাটতে হাটতে সেই আদিত্য বৃক্ষের অনেক কাছে চলে আসছি। মনে আবার বাচার আশা জেগে উঠলো আমার। চিত্কার করে অপরুপাকে বললাম আমি তোমাকে ভালবাসি অনেক ভালবাসি। হে অপরুপা তুমি যখন আমার পাসে থাকবে বলেছ তখন আমি হেরে যেতে পারিনা আমি পৌছাবই সেই বৃক্ষের কাছে। তুমি শুধু আমাকে অনুপ্রেরণা দিয়ে যেও।
নুতুন করে বাচার স্বপ্ন নিয়ে তার সাথে হাতে হাত রেখে হেটে চললাম। জীবনের রংটাই যেন বদলে গেল তাকে পাশে পেয়ে হায়রে ভালবাসা অনেক মধুর একটা জিনিস। ভালবাসাই পারে চলার পথে সকল বাধা দূর করে নুতুন জীবনে বেছে থাকার স্বপ্ন দেখাতে। যেকোনো কঠিন কিছু কোমল করা যায় শুধু ভালবাসা দিয়ে। এসব ভাবতে ভাবতে তার হাত ধরে চলতে চলতে দেখলাম সেই আদিত্য বৃক্ষটি আসতে আসতে স্পষ্ট হতে লাগলো চোখের দৃষ্টিতে। তার মানে আমি কি শেষ পর্যন্ত পৌছাতে পারলাম ? নিজেকে জয়ী মনে হলো অনেক কিন্ত এই জয়ের পিছনে যার এত অবদান সেই উপরুপাকে খুশিতে আমার এই বকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম। সেও আমাকে খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরল আর বলল তোমার বুকে এত শান্তি আমি যে আর কোনদিন এমন প্রশান্তি পাইনি। হঠাৎ দেখলাম আমাকে জড়িয়ে ধরে রেখেই অপরুপা ঘুমিয়ে পরেছে। সারাটা রাত আমার সাথে পথ চলতে চলতে ক্লান্ত অপরুপা আমাকে জড়িয়ে ধরে নিরাপদ আশ্রয় মনে করে আমার বুকেই ঘুমিয়ে পরেছে। তাই তার এই ঘুমটাকে ভাঙানোর শক্তি আমার ছিল না।
লাল সূর্য পূর্ব দিকে উদয় হল। এখনো সেই অপরুপা আমার বুকে ঘুম। আমি তাকিয়ে থাকলাম সেই আদিত্য বৃক্ষটির দিকে , সূর্য উঠার সাথে সাথেই সব ফল বিলীন হয়ে গেল। আমার কোন আফসোস হলনা ফলের জন্য শুধু এটাই মনে হল এই অপরুপাই আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ ফল আমার জীবনের বড় সম্পদ। তার ঘুম ভাঙ্গিয়ে ফল খাওয়ার সাহস আমার নেই। আমি ঘুম ভাঙ্গিয়ে ফল নেওয়ার ইচ্ছা না থাকলেও সূর্যের আলো তা মানলো না। সে ঠিকই আমার অপরুপার ঘুম ভাঙিয়ে দিল।
কে আপনি আর আমি বা এখানে কেন ? অপরুপার ঘুম ভাঙ্গার পর এটাই ছিল তার প্রথম প্রশ্ন। আমি বিন্দু মাত্র অবাক হয়নি। তাকে সব বললাম রাতের ঘটনা। সব সনে সে আমাকে বলল "আমি ঘুমের ঘোরে ছিলাম, এটা আমার একটা অসুখ যে আমি মাঝে মাঝে ঘুমের ঘোরেই পথ চলি। আমি শুধু তাকিয়ে থাকলাম অপলক ভাবে তার দিকে। সে ক্ষমা চেয়ে আমার কাছে বলল " আমাকে মাফ করে দিবেন আজ আমার জন্য আপনি আসতে আসতে মৃত্যুর দিন গনবেন কিন্তু এখন আমাকে যেতে হবে আমার ঠিকানায়। আমার ঘরে কেউ আমার জন্য অপেক্ষা করছে। তা বলে আমাকে সে অনুরোধ করলো তাকে সেই জায়গায় পৌছে দেয়ার যেখান সে আমাকে পিছন থেকে ডেকেছিল।
আমি এখন ছেলের মত জয়ী রাজার হাসি হাসতে হাসতে তাকে পৌছে দিতে যাচ্ছি।


