বৃহস্পতিবার, ২৬ জুন, ২০১৪

প্রহেলিকার আত্মকথন-৫

আজ আর আমি দিকভ্রষ্ট হইনা কোন বিকলাঙ্গ ছাঁয়ার প্রতিবিম্বে, কারো অনুগ্র চাহনিতে বাজাই না পৌরাণিক সরোদ। নিরুক্ত এই বর্ষায়, জলাশয়ে জন্মে না কোনো নীলপদ্ম, আসে না আর কোনো মিষ্টভাষী, বিলায় না মোহ। আমিতো এখন অমোঘ গণনায় অনায়াসে বলে দিতে পারি; আকাশে ভাসমান কুমারী মেঘের প্রসবকাল। প্রসিদ্ধ পোষাকে আবৃত উগ্র যে বাতাস; তার শরীর স্পর্শ করে বলে দিতে পারি গন্তব্যস্থল, সদর্পে আঘাত হানবে কার ঝরোকায়, কোন কাল নিশিতে। আজ আর কোনো স্বপ্নের কেন্দ্র বিন্দুতে করি না সঞ্চরণ। শুন্যগর্ভ দেহে হেঁটে যাই শ্মশান ধোঁয়ায়, স্ফুরিত আঁধারে খুঁজে নেই স্ফটিক শিশির কণা।

এখন আমার শাণিত দৃষ্টি এড়িয়ে, অনুপ্রবেশ হয় না কোনো অলীক জোছনার, হয় না একাকী শয্যায় কোন দ্বৈত দৃশ্যের অবতরণ। উদয় হয় না বিভ্রান্তির সূর্য এই অমর্ত্য আঙ্গিনায় অথচ আজও তুমি অতুল ধৃষ্টতায় এসে দখল করে নাও আমার প্রতিটি কবিতার শিরোনাম।

মঙ্গলবার, ২৭ মে, ২০১৪

প্রহেলিকার আত্মকথন-৪

রোষিত বাতাসের বিক্ষুব্ধতায় সচকিত মোড়ে ঝুলন্ত উর্বশী। কাঁচ জানালার স্বচ্ছতায় দেখি অনুক্ত শব্দের মিছিল তার চোখে। প্রত্যুষ পূর্বেই জেগে উঠা ঘোর কাটে মায়াবিষ্ট সপ্রতিভ দৃষ্টিতে। দেয়ালের স্থির চিত্রটি হঠাৎ স্বশব্দে নড়ে উঠে অশ্লীল শুন্যালয়ে। ক্রমশ বাড়তে থাকে দৃষ্টিক্ষুধার তপ্ততা। স্থিত হাসির মরিচিকায় দ্রবীভূত লবন স্তর, নিমিষেই স্পষ্টিত সহস্র যোজন দূরে দাঁড়িয়ে থাকা জ্যোৎস্নাহীন রাতে যুগল প্রণয়ের প্রতিবিম্ব। আমিও তাকিয়ে দেখি কত ব্যাকুলতায় আলো বিলিয়েছে জোনাকী! তর্জনীর ইশারায় দোদুল্যমান মেঘগুলো ঝরেছিলো বৃষ্টি হয়ে রৌদ্রদগ্ধ অবয়বে, সৃষ্টি হয়েছিলো শীৎকারের মহানাদ। অগ্নিকেতুর অস্বচ্ছতায় মত্ত হয়ে জড়িয়েছিলাম সেদিন; আর্দ্র ওষ্ঠের আড়ালে নিলীন সূর্যশিশিরের ইন্দ্রজালে। আজ অবোধেই চলি ছাঁয়াশুন্য পথ; পিছনে ফেলে রেখে প্রহেলিকার জলাশয়।

এভাবে আর তাকিও না হে উর্বশী, যদি দৃষ্টিতেই সৃষ্টি হয় নিরুদ্ধ জলপাহাড়, কক্ষভ্রষ্ট হয় নক্ষত্ররা। এক নিমিষেই যা অবতীর্ণ করে সংসর্পিত কল্পরাজ্যে পরক্ষণেই নিমজ্জিত করে অভাবিত এঁদো কূপে; এমন দৃষ্টির পালক আর না মেলেলই কি নয়?

শনিবার, ১৭ মে, ২০১৪

প্রহেলিকার আত্মকথন-৩

বিনিপাতে বিপর্যস্ত অদৃশ্য মানবী, দুরত্ব রেখাকে প্রলম্বিত করে নিরুদ্দিষ্ট হয়েছে নিশ্চুপে। পাচ্ছিনা তার কোনো পদচিহ্ন এই অপ্রশস্ত ভোরে; হারিয়েছে কোন পথে অজানা সুরে? বলে যায়নি কিছুই আমাকে; জাগবে কি'না ক্লান্ত হলে এই দু'চোখে কিংবা কৃত্তিম অন্ধকারে রাতের অবসানে। তবে জানি আমি, ধর্ম তার দিনান্তে অমর হবার। ক্লান্ত দেহে বীজ বুনে সে সতেজতার। নিয়ে যায় সুবর্ণময় দ্যোতনায় কল্পরাজ্যের অভিসারে। তার হন্তব্য দৃষ্টিতে শীতল হয় ব্যর্থ দিনের যন্ত্রণার লাভা। তার অস্পর্শতায় জ্বলছি অহরাত্রিতে নির্দয় সন্তাপে। ঘর্মাক্ত শরীরেই আজ অপেক্ষারত সেই মানবীর, যে কিনা রাতের আঁধারে এসে বিমোহিত করতো অযাচিত আলিঙ্গনে।
 
প্রতি নিমিষেই বাড়তে থাকে আলোকরশ্মির ঘনত্ব। দেহকে করে স্বেদসমুদ্রে সন্তরণ; স্বপ্নাবিষ্ট এই নয়নযুগল চেয়ে থাকে তার ফেরার পথে। 

বুধবার, ৩০ এপ্রিল, ২০১৪

প্রহেলিকার আত্মকথন -২

তোকে প্রবাহিত হতে দেখেছি তাদের শিরায় শিরায়, তোর ফেনিল পারদে বেদিক হয়ে কেউ কেউ নেমেছিলো কাল জলের প্রভাত স্নানে কিংবা মেতে ছিলো সূর্য অপেক্ষমান শিশিরের মুগ্ধতায়। দক্ষ শিকারীর ভঙ্গিমায় কেউ কেউ উপড়ে ফেলেছিলো উড়ন্ত পাখির শুভ্র পালক, হয়তোবা কারো দৃষ্টিক্ষুধায় ধূসর হয়েছিল সবুজ শেকড়। প্রলম্বিত হয়েছে কারো অন্ধরেখা তোর পর্ণমোচী সম্মোহনে। তাই বলে কি পেরেছিলি অমর হতে? কখনো ছুঁয়েছিলি সংকল্পের পর্বতচূড়া বিসর্পিত বাতেল্লায়?

জানি না, নিশ্ছিদ্র এই নিরেট দেয়াল টপকে কিভাবে সামনে এসে দাঁড়ালি, হৃদয়ের কার্নিশে বসত গেড়েছে অজস্র প্রাসাদকুক্কুট যারাই কিনা একদা আমাকে দমাতে পুঁড়িয়েছে আপন পাখা, অহর্নিশ করেছে পূঁজো শশ্মান ঘাটে।

শুক্রবার, ২৫ এপ্রিল, ২০১৪

প্রহেলিকার আত্মকথন -১

হামাগুড়ি দিয়ে নয় খুঁজেছি তোকে বিদ্যুৎ গতিতে। অজ্ঞতার নগ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে বিস্তৃত সপ্রতিভ আঁধারে, কখনো কখনো কুমারী বিকালের গাঢ়ো নিশ্বাসের হর্ষে, খুঁজেছি মুয়াজ্জিনের ডাকে ছুটে গিয়ে পবিত্র প্রাঙ্গনে, হন্য হয়ে খুঁজেছি সন্ধির হাট-বাজারে, দিশেহারা হয়ে অজন্তের সরু পথের শেষ প্রান্তে পেয়েছি ধর্ষিত হলুদ পাহাড়, নীলাম্বরের বুক থেকে এক টুকরো নীল ছিনিয়ে এনে মেখে দিয়েছিলাম তার পূর্নাঙ্গে। ভেবেছিলাম এই সবুজের মাঝেই বুঝি খুঁজে পাবো তোর অনুরূপ, কিন্তু দুষ্কর বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের অভ্রভেদী রহস্যের অন্তরালেই রয়ে গেলি তুই।

আমার মত করে গোত্রের সকলেই খুঁজেছিলো তোকে। আমিও জেনে গিয়েছি তোকে আর খুঁজে পাবো না মৃত্যুর প্রসবের পূর্বে।

মঙ্গলবার, ১ এপ্রিল, ২০১৪

উদাসী ডংকা বাজে জগৎ জুড়িয়া

ঘুম থেকে সকাল বেলায় উঠেই টুথব্রাশের উষ্ঠাগত প্রাণ দেখে দৌড়ে গেলাম নিচের লোকমান মিয়ার বউ-এর মুদির দোকানে (লোকমান মিয়া অসুস্থ তাই তার বউ দোকান পরিচালনা করে) । মুদির দোকানে টুথব্রাশ কিনতে গিয়ে শুনি দোকানে গান বাজছে, গানের কলিটা ছিলো এমন -
“আমি থাকি বাংলাদেশে তুমি থাক দুবাই,
মোবাইল দিয়া চুমা দিলে কোনো শান্তি নাই”
জিজ্ঞেস করলাম কি খালাম্মা সকাল বেলা এই গান ব্যপার কি ?
-আরে আর কইও না, ওই শালার (উনার স্বামী) যেই ব্যরামে ধরছে মনে হয় এইবার মরবো। আমার আর ভাল্লাগে না এই জ্বালা, তাই মনের দুক্ষে গান হুনি।
উনার উদাসী কথাটা শুনে আমি আর কথা না বাড়িয়ে চলে আসলাম, সবার মনেই তো যন্ত্রণা থাকে, গান শুনে যদি উনার যন্ত্রণা দূর হয় তাহলে আমার ক্ষতি নাই। তাই টুথব্রাশ নিয়ে বাসায় এসে অফিসে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে বের হয়ে গেলাম নাস্তা না করেই কারণ গ্যাসের সিলিন্ডার গতরাতে শেষ হয়ে যাওয়াতে গ্যাস চুল্লীর মুখটাও ছিল খুব উদাসীন। গ্যাস চুল্লীর উদাসীন মুখ দেখে আমার মা যখন বাবাকে বলল নুতুন সিলিন্ডার কিনে আনতে তখন বাবা হাস্যজ্জ্বল মুখটাতে উদাসীন ভাব নিতে কালক্ষেপন করলো না। যাইহোক আমি পালাই কারণ কখন যে আমি আবার এই জালে জড়িয়ে পরি তার কোনো ঠিক নাই।

অফিস খুব সন্নিকটে হওয়ায় পদব্রজেই পৌঁছে গেলাম। পৌছানোর সাথে সাথেই অফিস বয়কে ডাকলাম। সে আসলে দেখালাম তার মুখটাও একটু উদাসীন হয়ে আছে যাইহোক ক্ষুধায় পেট জ্বলে যাচ্ছে তাই আর কথা না বাড়িয়ে তাকে বললাম নাস্তা নিয়ে আয়, মেনুটাও বলে দিলাম কি আনতে হবে। সে যথা সময়ে নাস্তা নিয়ে আমার টেবিলে হাজির আজ। আজকের আগে তা কখনো হয়নি। এর আগে যতবারই তাকে দিয়ে নাস্তা আনিয়েছি প্রতিবারই সে গরম গরম নাস্তাকে ঠান্ডা করে আমার সামনে হাজির করেছে। আজকে তাকে ধন্যবাদ না দিয়ে পারলাম যখন দেখলাম নান রুটি থেকে গরম গরম ধোঁয়া বেরুচ্ছে।

-তুইতো অজ্যিয়া সেরহম খাম গড়ি ফেলাইয়্যুছ। এতো সড়ে সড়ে লইয়াচ্চুছ? ধৈন্যবাদ যা।

(তুই তো আজকে খুব ভাল কাজ করেছিস।এত তাড়াতাড়ি নিয়ে আসলি ? ধন্যবাদ )

-বদ্দা ন আনিলে কেন অইবো ? অনে আর বস ন না ?

(ভাই না আনলে কিভাবে হবে আপনি আমার বস না ?)

-আইচ্চা যা এহন।

(আচ্ছা যা এখন )

- বদ্দা ওগ্গু খতা হইয়্যুম না ?

(ভাইয়া একটা কথা বলবো?)

-আইচ্চ়ে

(আচ্ছা )

-বদ্দা রাতিয়্যা ওগ্গু কম আছিল টিয়্যা দিত ফারিবানা কিছু ?

(ভাইয়া কিছু টাকার দরকার ছিল রাতে একটা কাজ আছে ,দিতে পারবেন ?)

-কত ?

-১০০০টিয়্যা।

(১০০০টাকা)

তখন তাকে টাকাটা দিলাম। টাকাটা হাতে নিয়ে সে আমাকে বললো ::

-বদ্দা বহুত বড় উপকার ওইয়্যে গোডারাইত ইবার টেনসনে ঘুম যাইন্ন্য পারি।

(ভাইয়া বড় উপকার হলো, সারারাত এটার টেনশনে ঘুম যেতে পারিনি)

এই কথাটা বলেই সে চলে গেল সাথে সাথে গরম নাস্তার কথাভুলে ভাবতে লাগলাম কিরে মাত্র এক হাজার টাকার জন্য সে রাতে ঘুমাতে পারল না ? আর এই এই অল্প টাকাটার জন্যই তার মুখটা একটু আগে উদাসীন ছিলো। যাইহোক আগে খেয়ে নেই, এখনো অফিসের সব সহকর্মীরা আসেনি।

সকাল তখন ১০টা ৪৫ মিনিট।

হঠাৎ কাজের ফাকে মনে পড়ল আমার গার্ল ফ্রেন্ড মানে আমি যাকে ভালবাসি আর কি তার আজকে পরীক্ষা দিতে যাওয়ার কথা। পরীক্ষা শুরু হবে ১১তা থেকে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সাথে সাথেই তাকে ফোন দিলাম। দুই’বার ফোন দেওয়ার পরও যখন ধরল না তখন বুঝে নিলাম ডাল ম্যা কুচ কলা হ্যায়। ভয়ে ভয়ে ছিলাম অনেক ক্ষণ না জানি পরীক্ষা শেষে কি প্রলাপ শুনতে হয়। ভয় তা বেশিক্ষণ থাকলো না যখন বস-এর কর্কশ গলা শুনতে পেলাম। বস ডাকছে

-জী বস?

-আপনাকে একটা কথা বলতে চাই যদি কিছু মনে না করো ?

-জী বস, নির্দ্বিধায় বলতে পারেন।

-কি যে বলতাম !! আমার ছোট ছেলেটার ইদানিং খুব অবনতি হচ্ছে ওকে এখন আর বাসায় রাখার কোনো উপায় নেই। ভাবছি ওকে কোনো মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রে দিয়ে দিবো। তোমার কি কোনো অভিজ্ঞতা আছে কোথায় দিলে ভালো হবে? আমার এই একটা ছেলে মাত্র সে দিন দিন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে মাদকের ফাঁদে পড়ে।

বলতে বলতে দু’ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল তার চোখের কোণে।

আমি তাকে আশ্বস্ত করলাম যে “অশ্রু” মাদক নিরাময় কেন্দ্রটি ভালো হবে আর তাছাড়া সেখানে আমার এক পরিচিত মানুষের শরণাপন্ন হওয়া যাবে। শুনে তিনি খুসি হলেন এবং একটু পূর্বের সেই কালো ছায়াটা দূর হয়ে একটু মিষ্টি রোদের হাসি দেখা যাচ্ছে।

সময় চলে যাচ্ছে ঘড়ির কাটা দেখি একটু ভালো করেই দৌড়াচ্ছে আজকে। দুপুরের খাবার সময় হয়ে গেছে। খেতে যাব এমন সময় মোবাইলটা বেজে উঠলো। মোবাইলের পর্দায় প্রিয় বন্ধুর নামটি দেখাতে একটু ভালো লাগলো সকাল থেকে শুধু মানুষের উদাসীনতা দেখেছি ও আবার সবসময়ই একটু চঞ্চল টাইপের। যাইহোক ফোনটা ধরে শুনলাম বন্ধুর উত্তেজনাপূর্ণ কন্ঠ।

-দোস্ত কই তুই?

-এইতো অফিসে, কেন কি হয়েছে ?

-আরে দোস্ত আর বলিস না সুমিকে(অর গার্ল ফ্রেন্ড) এই মাত্র দেখলাম অন্য একটি ছেলের সাথে কাজী নজরুল স্কোয়ারে ঢুকছে। তুই একটু আয় দোস্ত আমি যে পাথর হয়ে যাচ্ছি।

-আচ্ছা, আচ্ছা তুই থাক আমি আসছি।

এই বলে দুপুরের খাবারের প্লেটটি ফেলে পকেটভর্তি সান্তনার মালা নিয়ে রওয়ানা হলাম কারণ আমার আর কি করার আছে গিয়ে কতক্ষণ উদাসীন হওয়ার ভাব ধরে থেকে সেই সান্তনার মালা গলায় পরিয়ে দিব। রাস্তায় বেরিয়ে উদাসী ভর-দুপুরে সিএনজি না পেয়ে আগ্রাবাদ থেকে রিক্সায় উঠলাম। কিছুদূর যেতেই ট্রাফিক পুলিশের উদাসীনতায় পরলাম মস্ত বড় হা করে থাকা ট্রাফিক জ্যামে। টানা আধ ঘন্টা পর মুক্ত হয়ে কাজী নজরুল স্কোয়ারে গেটে গিয়ে দেখি বন্ধুটি ফুচকা দোকানের বেঞ্চে বসে আছে। কথা বলার কোনো সাহস করলাম না শুধু জেনে নিলাম যে তার গার্ল ফ্রেন্ড বর্তমানে উদাসীন ভালবাসায় মত্ত হয়ে পার্কের এক কর্ণারে বসে আছে সদ্য উদিত প্রেমিকের পিঠে পিঠ লাগিয়ে। আমিও একটু গিয়ে দেখে আসলাম হ্যাঁ ঠিকই আছে সেটা সুমি। ফিরে এসে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী সান্তনামালা তার গলায় পড়িয়ে তাকে নিয়ে গেলাম দূপুরের খাবার খেতে। এক প্রকার জোর করেই তাকে খাওয়ালাম। খাবারের বিল দিয়ে বের হয়ে সিদ্ধান্ত নিলাম আজকে আর অফিসে যাব না কারণ বন্ধুটিকে একটু সময় দেওয়া দরকার কারণ ভুলে যায়নি যে আমি প্রথম প্রেমে ছ্যাঁকা খাওয়ার পরে সে আমাকে যথেষ্ট সময় দিয়েছে।

বন্ধুরা এখানে প্রায় সবাই আছে। খুব ভালো আড্ডা জমেছে এখানে। এমন সময় হন্তদন্ত হয়ে আড্ডা খানায় এসে হাজির এলাকার বড় ভাই। তাকে সন্মান জানাতেই হয়। তাকে সন্মান জানানোর লক্ষ্যে সবাই যেন একসাথে দাঁড়িয়ে একই সুরে সালাম জানালাম। কিন্তু বড়ভাই যে দেখি আজ অন্যদিনের মত ভাব নিলোনা। মিষ্টি সুরের কন্ঠে:

-আরে বসে থাক তোরা। বড় হয়েছিতো কি হয়েছে ? আমিতো সবসময় তদের সাথে বন্ধুর মত চলাফেরা করি, তোদেরকে অনেক ভালবাসি।

আরেক বন্ধু মাঝখান থেকে বললো :

-ভাই আজকে হঠাৎ এইখানেই চলে এলেন আপনি না এসে আমরা বললেই তো আমরা চলে যেতাম।

-সামনে দিয়েই যাচ্ছিলাম তুদেরকে পাব এখানে জেনে ভাবলাম একটা খবর দিয়ে যাই। আগামীকাল সকালে একটু তোরা সবাই থাকিসতো। কালকে একটা মিটিং আছে সেখানে আমরা একটা মিছিল নিয়ে যোগ দিব। আমি চাই অন্যদের চেয়ে আমার মিছিলের লোকসংখ্যা একটু বেশি হোক।

এইগুলো শুনার পর তাকে আশ্বস্ত করলাম আমরা সবাই যাব যদিও জানি কেউই যাব না আমরা। তিনিও চলে গেলেন সানন্দে তবে আমাদের আড্ডাটা যে বিষাদময় করে দিয়ে গেছেন সেটা এখন সবার মুখের দিকে তাকালেই বুঝা যায়। ঠিক এমন সময়ই মোবাইলে আসল ম্যাসেজ:

Tumi kivabe parle amake sokale call na diye thakte ? ami onek koshto peyechi. Tumar call na paoate amar exam valo hoyni ekhon amar mon khub kharap.

হলো তো এবার?? কি আর করা সাথে সাথে ফোন দিয়ে তার দোষ স্বীকার করে তার গলাতেও সান্তনার মালা পরিয়ে দিলাম।

সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হল আর এই সময়টাতে কত যে উদাসীনতা দেখেছি সেটা লিখতে গেলে পাঠকরা উদাসীন হতেও দেরী করবেন না। রাতে বসে বসে ভাবছিলাম আমরা প্রতিদিন কত কিছুতেই না উদাসীনতা দেখি। আজকাল রক্তের সাথে বিষাক্তভাবে এই উদাসীনতা মিশে গেছে আমাদের।আমরা বুঝতে চাই না যে এই উদাসীনতার প্রতিফলনে আমরা আমাদের নিজেদের পরিচয় ভুলে যাচ্ছি। ভালোভাবে তাকিয়ে দেখলে লক্ষ্য করা যায় কত মানুষের বিচরণ আমাদের চারপাশে আর সবাই যেন নিজেকে উদাসীনতার সাগরে ডুবিয়ে রাখতেই ভালবাসে। কিন্তু সেটা কেন ? তাতে কি লাভ???

শুক্রবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪

মাহমুদল হাসান লিটন

বন্ধুত্ব, ভালবাসা এসবের সংজ্ঞা দেওয়া আমার কাজ নয়। আর এসব শব্দের সংজ্ঞা দেওয়া আমার পক্ষেও সম্ভব না। এই দায়িত্ব তাদের, যাদের কালজয়ী লেখনী পড়ে আমিও আজ আমার বন্ধু সম্পর্কে কিছু লিখতে অনুপ্রেরণা পেয়েছি। 

 মাহমুদল হাসান লিটন, আমার জীবনের একজন গুরুত্বপূর্ণ মানুষ। আমার এই লেখায় তাকে বন্ধু বলে আখ্যায়িত করতে চাই না কারণ আজ পর্যন্ত কখনো তাকে সরাসরি বন্ধু বলে ডাকা হয়নি। কখনো গালাগালি, কখনো মামা আবার কখনো তার কোনো ব্যঙ্গ নামেই তাকে ডাকা হত। সেই স্কুল জীবন থেকে শুরু করে আজও সে আমার সাথে রয়েছে সবসময়। কেমন জানি এক সভাব তার মাঝে। তার সভাবের কারণেই হয়তো আমার মনের প্রিয় মানুষটির জায়গাটা শুধু তার জন্য বরাদ্ধ। আমার জীবনের অনেকটা সময় তার সাথে কেটে গেছে আর এখনো যাচ্ছে এবং মনে হচ্ছে চলে যাবে ওর সাথেই সারাটাজীবন। আমাদের দুজনের জন্মতারিখ থেকে শুরু করে অনেক দিকেই যেন মিল রয়েছে। কেন জানি আমার চাহিদা খুব সহজেই সে পারে। আজ তাকে ফেলে আমি একা সম্পূর্ণ একা একজন মানুষ। 

আমি আজ ৪ বছর ধরে প্রবাসে রয়েছি। প্রবাস জীবনের সকাল, বিকাল,সন্ধ্যা,রাত সবই আমাদের কাছে একই সমান কাটে। মফস্বলের বখাটে চঞ্চল ছেলেটিও আজ চুপচাপ জীবন কাটায় আর এটা যেন প্রবাস জীবনের ধর্ম। কাজ শেষ করে এসে ঘুমানো আবার ঘুম থেকে উঠেই আবার কাজে যাওয়া এই সূত্রে কোলে যাচ্ছে জীবন মানে আমার প্রবাস জীবন। যখন হাপিয়ে উঠি এই জীবন নিয়ে , যখন ইচ্ছে করে সব ফেলে চলে যায় আবার সেই পুরনো জীবনে তখন কি করি জানেন? হা হা হা কিছুই না। বাধ্য হয়ে সবকিছুকে ভুলে যেতে হয় কারণ পিছুটান রয়েছে কিছু জীবনে আমার। 

এই হলো আমাদের সংক্ষিপ্ত পরিচয়। আজকে লিখাটার মূল উদ্দেশ্য হলো তার প্রতি আমার কিছু ক্ষোভ প্রকাশ করা। আমার এই প্রবাস জীবনে আমি শুধু এই মাহমুদুল হাসান লিটনকে পেয়েছি আমার পাশে। কেমন জানি একটা উদ্ভট অভিনেতা সে। মাঝে মাঝে যখন খুব খারাপ লাগে তখন তাকে বলি মনের দুঃখের কথা তখন সে আমার কোনো কথারই মুল্য দেয় না আমি যখন দুঃখের কথা বলি তখন সে হাসে। হেসে হেসে বলে এমন কিছু কথা বলবে যা তখনের জন্য কষ্টটা ভোলে যেতে আমি বাধ্য হয়ে যাই। আবার সুখের সংবাদ দেওয়ার পর তার মুখে হাসি থাকে না। 

কিছুদিন আগে একদিন রাতে তাকে বললাম যে আমি প্রমোশন পেতে যাচ্ছি তখন সে আমাকে কিছু বলল না যেখানে সে আমার কষ্ট শুনে আমার সাথে হাসি মুখে কথা বলে আজ সে আমার খুশির সংবাদ শুনে চুপ করে থাকাতে আমি অবাক না হয়ে পারলাম না। পরক্ষনেই বোঝতে পারলাম সে কাদছে , কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর আমাকে সে বলল " মামা তুমি ভালো আছ শুনলে আমার খুব ভালো লাগে , তোমার খুশির সংবাদ শুনে কেন জানি চোখ দিয়ে পানি চলে আসল না কেদে আর পারলাম না " এই হলো মাহমুদুল হাসান লিটন। আমার এই মানুষটার জন্য আমি মহান আল্লাহর দরবারে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি তাকে আমার জীবনে দেওয়ার জন্য। 

সেই মাহমুদুল হাসানের আর একটা কথা বলে আজকে শেষ করতে চাই। 

গতসপ্তাহে একদিন নিজেকে খুব উচ্ছল মনে হলো ,মনে হলো প্রবাসে থাকলেও আজ আমার কোনো দুঃখ নেই। ফিরে পেলাম সেই মানুষটিকে যেই আমি ছিলাম পূর্বে। সেদিন যেন আসলেই অন্যান্য দিনের চেয়ে আলাদা ছিল। ভাবছিলাম আজকের দিনে তাকে খুব দরকার কারণ তার সাথে ভালোভাবে তেমন কোনো কথা হয় না। ঠিক এমন সময় আমি ডাকার আগেই যেন সে আমার কাছে আসলো তখন মনে হলো দুবাই থেকে বাংলাদেশের দুরত্ব ৫০০০ মাইল হলেও তার আর আমার বসবাস যেন একই বৃক্ষের নিচে। শেয়ার করলাম তার সাথে যে আমি আজ অনেক খুশি। কথা বলতে বলতে হঠাৎ তাকে জিগ্ঘেশ করলাম আচ্ছা মামা আজকে আমার এত খুশি লাগছে কেন ? সে আমাকে বলল এই ভাবে ""একাকিত্বের সাথে বসবাস করার কারণে আজকে তোমার এই চঞ্চলতা। মনের মাঝে চঞ্চলতা গুলো পুষে রাখতে রাখতে হাপিয়ে ওঠার কারণে আজকে মনের ভিতর চেপে রাখা কষ্টগুলোর প্রতিফলন এগুলো। তখন অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলাম তার চিরন্তন সত্য মেসেজটার দিকে আর মনে মনে বললাম হায়রে পৃথিবী আমার পাশে এমন শত মানুষ আছে যাদের কারো আমার দরকার নেই আর যার জন্য আমার বেছে থাকা তাকে রেখেছ আমার কাছ থেকে অনেক দূরে।

শুক্রবার, ২৪ জানুয়ারি, ২০১৪

আমার পথ


আমি শত পথের মাঝে থেকে একটি পথ বেছে নিয়েছিলাম আমার পছন্দমত। অন্য কোনো পথ যেন আমায় আকৃষ্ট করত না।  তাই হেটেছি শুধু একই পথধরে, প্রতিদিন, অবিরাম। মাঝে মাঝে হোচট খ্য়েছি তবুও পথটাকে যে ভালোবেসে ফেলেছিলাম আর তাই এই পথের মায়া ছাড়তে না পেরে হেটে চললাম অবিরাম। স্বপ্ন ছিল এই পথ ধরে হেটে গেলে দেখা পাবো একটি জনপদের, আর জনপদের দেখা পাওয়াই ছিল আমার এই পথে হেটে চলার প্রধান উদ্দেশ্য কারণ শত বছর হলো কোনো জনপদের দেখা পেলাম না। এই পথ ধরে হেটে গেলে যে জনপদের দেখা পাব তার একটা প্রবল বিশ্বাস মনে ছিল আমার তে শুধু হেটেই চললাম কিন্তু পথের যেন আর শেষ হয় না। 

চলতে চলতে চলার পথে একদিন দেখলাম এক মহিলা প্রসব বেদনায় আর্তনাদ করছিল, যেহেত আসেপাসে কোনো জনপদ নেই তাই তার আর্তনাদে যেন আকাশ বাতাস সব কেপে উঠেছিল। কিন্ত আমি  পাষান ছিলাম আর এতই স্বার্থপর ছিলাম যে পথ দিয়ে হেটে জনপদ পাওয়ার লোভে সেই গর্ভবতী মহিলাটার দিকে আমি ফিরেও তাকালাম না. হেটে চললাম সামনের দিকে আমার সেই পুরনো পথে। 

আবার কিছুদূর এগিয়ে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে যখন একটি বৃক্ষের নিচে দাড়ালাম তখন আমার কানে একটি মা পাখির কাঁন্নার শব্দ এলো।  উপরের দিকে তাকিয়ে দেখলাম মা পাখিটি তার তৃষ্ণায় ,অনাহারে মূমূর্ষ হয়ে যাওয়া বাচ্চাটির জন্য আর্তনাদ করছিল আর আমি তখন তাড়াতাড়ি  করে সেখান থেকে প্রস্থান করলাম। সেখান থেকে পালিয়ে আবার আমার সেই পুরনো পথে হাত শুরু করলাম।

শেষ যেন হতে চায় না এই পথ আমার। আর কতদূর?

 চলতে চলতে হঠাৎ একদিন সকালের আলোতে দেখি সামনে আর কোনো পথ নাই. কিন্ত একি ??? আমি এতদিন যেই জনপদের লোভে হেটে এসেছি অবিরত সেই পথ বিলীন হয়ে রূপ নিল বিস্তর এক মুরুভূমিতে। যেই মুরুভুমির কোনো শেষ নাই। 

না আমি আর পিছনে ফিরে যেতে পারব না, পাষানের মত সব ভুলে এই পথকে যখন ভালোবেসে এতদূর হেটে এসেছি তখন আমি আর পিছনে ফিরে যেতে পারব না। এই পথ যখন আমাকে ভালোবেসে জনপদের বদলে এই মুরুভমিতে এনে দাড় করলো তখন এই মুরুভমিই হোক আমার শেষ ঠিকানা আর এখানেই হবে আমার শেষ নিশ্বাস। 

Twitter Delicious Facebook Digg Stumbleupon Favorites More

 
Design by প্রহেলিকা