শুক্রবার, ২০ জুন, ২০১৪

নীল বৃক্ষ

এখন কি সেই বৃক্ষের কান্নার শব্দ শুনতে পাও; ভর দুপুরে যার কাছে ছুটে যেতে লোকচক্ষুর আড়ালে? রঙিন লিলেনে আবৃত করে চাঁদমুখটি ছুটে গিয়েছিলে কত নিষিদ্ধ সময়ে? কলঙ্কের আশঙ্কায় যখন আঁতকে উঠেছিলে, ল্যাম্প পোস্টের আলোতে দেখে নিজের প্রতিবিম্ব, তখনি অদম্য ব্যাকুলতায় সে ছুটে এসেছিলো স্থানচ্যুত হয়ে। সুপ্রশস্ত বুকে জড়িয়ে দূর করেছিলো ভয়্সমগ্র, ভেজা চুলে বুলিয়েছিলো বিশ্বাসী হাত। মনে পড়ে কি সেদিনগুলোর কথা? নতজানু হয়ে বলেছিলে, তার সবুজ শেকড়ের নির্যাস পানে পূর্ণতা চাও, তুমি হাসতে চাও সদ্য গজানো সবুজ পত্রের মত; মনে পড়ে কি? তোমার আকুতিতে দ্রবীভূত তার নিরেট দেহ। এক নিমিষেই ছুটে গিয়েছে, “পৃথিবী”-এর বুক থেকে “প” কে কেড়ে এনে তোমাকে দিয়েছে “পূর্ণতা”, অবিলম্বে ফুটিয়েছে হাসি নিস্বার্থে। আজ কি তার কোনো খবর রাখো; যে তোমার ওষ্ঠে ওষ্ঠ রেখে কষ্ট শুষে নীল হয়েছে? চির সবুজ বনানীতে দাঁড়িয়ে রয়েছে নগ্ন নীল বৃক্ষ হয়ে?

পূর্ণতার দর্পণে উদ্ভাসিত মুখ দেখে; আজ নিশ্চই তোমার কোনো দুঃখ নেই। এখন তোমার হাসিতে বাতাসের পিঠে চড়ে বৃষ্টিরা নেমে আসে ঝুলবারান্দায়, আকাশের বুকে প্রসারিত হয় উদোম রংধনু, এই এক চিলতে হাসিতেই সৃষ্টি হয়ে সুবিশাল সমুদ্র অতঃপর তার ভূতলে হারিয়ে যায় মঙ্গল, বুধ, শুক্র এবং “প” বিহীন পৃথিবী।

স্কুটার

কালি শেষ হবার আগেই রেশমী কলম ছুঁড়ে ঝুপড়িতে বসে রক্তাম্বরে, মনের মুকুরে দেখে নবোদিত দিনের প্রতিচ্ছবি। জেনেও না জানার ভান ধরে তাকিয়ে রয়েছে পুল সিরাতের দিকে। স্কুটার তড়িৎ গতিতে ধেয়ে আসবে অথবা ভ্যানে চড়ে। মাথার উপর দিয়ে উড়োজাহাজ উড়ে যাবার শব্দও তার কাছে মনে হয় স্কুটার এই এলো বুঝি। আসবেতো নাকি পাকা ধানের অভিসম্পাতে নিক্ষিপ্ত হবে জাহান্নামে? আমতা আমতা করতে করতে পিড়ি পেতে বসে থাকা উঠানে গিয়ে বাবাকে বলে আসবেতো? ওলা ওঠা বাবারও সাধ্য নেই না বলার। দাঁতে দাঁতে খিল ধরলেও সদ্য কলানো স্বপ্ন ভেঙ্গে দেওয়া ঠিক হবে না।

পূর্বাহ্নের প্রারম্ভে স্কুটার হাজির করার প্রতিজ্ঞায় কালবেলাতেই কলেবরে তেল মেখে নেমে পরে লুঙ্গি পরে, একবারও সে বুঝতে পারেনি জমিদার বাড়ির নবোঢ়া অপেক্ষমান ফুলেল শয্যায়। কোমরে দড়ি বেধে যখন সারা পাড়া ঘুরানো হলো তা দেখে রেশমি চিপটান কাটে, উপহাস করে আধ বিঘৎ জিভ বের করে।

সোমবার, ১২ মে, ২০১৪

লোকালয়

মুদ্রাদোষের সমুদ্রে সাঁতার কাটতে গিয়ে হাঙ্গরের মুখে সম্মুখীন হয়েছিলাম, তাই বলে এতো সাধ করে খনন করা সমুদ্রে সাঁতার না কেটে কি পারা যায়?

মন্থর বাতাসের কুলগ্নে কুলঙ্গি থেকে দিন পঞ্জিকা নামিয়ে উল্টে যাচ্ছি উন্মীলিত করে রাখা পাতাগুলো, যতই উল্টাচ্ছি ততই সক্রিয় হচ্ছে ঘ্রাণেন্দ্রিয়, খুব চেনা সুঘ্রাণ ভেসে আসছে, না না পঞ্জিকার পাতায় কাটা দাগের মত পুরোনো নয় একদম সতেজ, সদ্য প্রস্ফুটিত গোলাপ সুভাষ। যতই উল্টে যাচ্ছি ততই নিকটে আসছে। শকুন্তলা নয়, নয় দুর্গামাতা,গত রাতে স্বপ্নে এসে হিম পরশে ছুয়ে যাওয়া পুষ্পবতী। জড়ীভূত হাত চেপে ধরে আতপ্ততায় ঠিক যেমনটি করেছিলো গতরাতে। লোকালয় দেখবো বলেই বাঁধা দেইনি কোনো, সাথে ছিলো স্বপ্নের মত না হারানোর প্রতিঙ্গা। কথা রেখেছে নিয়ে এসেছে কাঙ্খিত লোকালয়ে সময়ের দুর্দৈব দৈর্ঘ্য পার করে। পড়ি মরি করে তাকিয়ে দেখি বিচরিত সকল সুখকে পূর্ব জন্মের পর-হিংসা ভুলে।

নতুন নগরীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশে ভঙ্গি জানাছিলো না ধারাক্রমেই পরম আদরে বুকে টেনে নেই দেহারার ফুলেল বিছানায়। দুরুদুরু চিত্তে নিশ্বাস ফেলি ভাবি এই বুঝি স্বপ্ন ভেঙ্গে গেলো আবারো। তার তেরচা দৃষ্টির চাঁদরে ঢেকে যায় ভয়, জয় হয় চঞ্চরীকের। ঘর্মাক্ত কলেবরেই ঘুমিয়ে পরি তার বুকে মাথা রেখে তার নির্দেশে।

পাশ বালিশ হাত রেখে যখন আল মাহমুদের কাব্য সমগ্রের ছোয়া পেলাম না তখনি চিৎকার দিয়ে উঠি। না সে হারিয়ে যায়নি, আজ সে পাশবালিশে নয় ঘুমিয়েছে আমার বুকে।

বুধবার, ৩০ এপ্রিল, ২০১৪

অনুভূতি

উত্সর্গ: শ্রদ্ধেয় ছাইরাছ হেলাল কে, যিনি পাঠক হিসেবে আমাদের পাশে রয়েছেন বিস্তৃত আকাশের মত উদার হয়ে, এখনো শক্ত করে কলম ধরে রেখেছি তারই অনুপ্রেরণায়। তার সংস্পর্শেই রয়ে যেতে চাই। আমার এই ক্ষুদ্র লিখাটি আজ তাকেই উত্সর্গ করলাম। আর হ্যাঁ আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ লিখাটি হবে তার নামেই।

=============================================================================================

প্রস্তর চাপা ঘুমটি ভেঙ্গে গেলো মাঝরাতেই, আমার কাছে তা মাঝরাত হলেও বুড়ো হাবড়াটার কাছে ভর দুপুর মনে হবে না তা কিন্তু না। যক্ষায় আক্রান্ত হয়ে দিব্যি ঘোষণা দিয়ে যাচ্ছে জব্বারের বলীখেলার। ঘোষণা শুনে অকারণেই হাসতে হাসতে লুতুপুতু শুরু করলাম, খুলে দিয়ে বন্ধ দরজাটি তাকেও জানিয়ে দিলাম আমিও 'বাঁজে বীণ নাঁচে নাগিন-এর পুরনো ভক্ত, যাবো অবশ্যই যাবো।

নিশ্ছিদ্র মস্তিষ্কের অন্দরমহলে কোয়াশিয়াটি খুব দ্রুত বেড়ে উঠেছে, এই দিকে পঞ্চপ্রদীপ জ্বালিয়ে মোটা ঠোটে ঈশ্বরোপাসনায় নিজেকে সমর্পিত করার ভাব ধরেছি অপরাঙ্মুখ হয়ে। প্রার্থনা করবো আজ, করতেই হবে, এই ভেবেই কাঁচা সন্ধ্যাতেই পদ্মাসনে বসে পরি, পরক্ষণেই মনে পড়ল প্রতিজ্ঞার কথা। আর কি দেরী করা যায়? পদ্মাসন থেকে উঠেই দিলাম ভৌ-দৌড়, ঈশ্বরতো আর অবোদ্ধা নন, জানেন সবকিছু তাছাড়া তার কাছে কি প্রার্থনা করবো সেটা এখনোতো ঠিক করিনি।

একি!! সবাই দেখি পাঁঠার মত পাঁতি ধরেছে, আমার ঠাই কোথায়? না কোথাও ঠাই নাই। উর্মির নৃত্যে সিক্ত হতে এসে দূর থেকে তার গর্জন শুনেই আহ্লাদিত করতালি বাজিয়ে অনায়াসে এগিয়ে যাই মৃত্যুকুপের দিকে। মাথার উপর রেখে অখন্ড আকাশ, আমি নিষ্পলক তাকিয়ে রয়েছি নিচের আরোহীর দিকে। ডিপফ্রিজে রেখে হৃৎপিন্ডটি এখনি মেতে উঠবে অনুরঞ্জক হয়ে সবার মনোরঞ্জনে। শুরু হলো তার সচুতরতা। হঠাৎ নজরে আসলো গা ঘেষে দাড়িয়ে থাকা রমণীর প্রসন্নতা এবং তার পাশের জনের গলদশ্রু। আমিতো শিশুমুখে তাকিয়ে রয়েছি তাদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখে। আমি কাকে অনুকরণ করবো সেই ভাবনা থেকেই দিলাম উপরের দিকে হাত তুলে।

কপটতার প্লাবনে হারিয়ে ফেলেছি নিজেকে,
হারিয়েছি অনুভূতির সাথে আলিঙ্গনের স্বাদটুকু।
নেমে আসো অধ্রুব হয়েই অবিলম্বে কিংবা-
বাতাসে প্রেরণ কর তোমার সর্বশেষ ওহী,
জানিয়ে দাও সুখ দুঃখ প্রসবিত হয় কার গর্ভে?
কোথায় তাদের সুবিন্যস্ত করবো, কিভাবে?

জবাব পাবো না জেনেই বলেছিলাম দু চার বাক্য। থাকবো না চলে যাবো, থাকলেই কি লাভ কিংবা চলে গেলেইবা কি ক্ষতি? নিজেতো বুঝি না তাই পর্বাস্ফোটের ধ্বনিতেও জবাব মিলে না। স্বয়ংক্রিয় ভাবেই দু'পা চলতে শুরু করে বাতাসের ধূর্ত ইশারায়।

ধুলো পরা পালঙ্কে পিঠ লাগিয়ে রেখেছি সেই কখন থেকে, ঝুপড়ির ফুটো দিয়ে যখন জোত্স্না প্রবেশ করলো তখনই বুঝতে পারলাম না অনুভূতিগুলো  এখনো হারিয়ে যায়নি। তারা হারায় না, ছেড়ে চলে যায়। তাই এখনো দেখা যায় তাদেরকে পুরা-তাত্ত্বিক পোশাকে, অতন্দ্রহীন হয়ে ঘুরে বেড়াতে ঠাকুর বাড়ির আশেপাশে। বক ধার্মিক হয়ে তার অঙ্কোপরিতে বসে বিনে পয়সায় খপোতে চড়তে চায় নিস্তরণের আশায়। মাঝে মাঝে আবার দেখি তক্কেতক্কে থাকে শীতল চক্ষু তাতিয়ে আঁধারের কালী মার দিকে, কখন জেগে উঠবে অন্তর্বাহী হবে ঘুমনদী হয়ে। আবার দেখা যায় অমৃত প্রেমজল পান করে আশ্রিত হতে কারো 'অ' লেখার ছিন্নাংশে, সম্ভাবনীয়তা কাটিয়ে নির্ভাবনায় ভাবনার সাথে খাতির জমায় দু চুম্বকীয় চুম্বনে।
 
আর তাই আমিও আর তাদের ফিরিয়ে আনতে চাই না, চাই না ফিরে আসুক অক্রিয় অগাকান্তের এই শ্যাওলা আবৃত হৃদয় কোটরে।

Twitter Delicious Facebook Digg Stumbleupon Favorites More

 
Design by প্রহেলিকা